18 C
Bangladesh
Saturday, December 10, 2022
Home অপরাধ পুলিশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ - কেন অপরাধে জড়ায় তারা?

পুলিশের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ – কেন অপরাধে জড়ায় তারা?

২০১৯ সালের তেসরা ডিসেম্বর টেকনাফের হোয়াইকং ইউনিয়নের সিএনজি চালক আব্দুল জলিল টেকনাফ বাজার থেকে নিখোঁজ হন। একজন প্রতিবেশীর কাছ থেকে তার স্ত্রী সেনুয়ারা বেগম খবর পান, মি. জলিলকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তিনি থানায় ছুটে যান, কিন্তু থানা থেকে তাকে বলা হয় যে সেখানে নেই তার স্বামী।

“তিন মাস পর আমার বাড়িতে ওসি প্রদীপ আসে। এতদিন নেই নেই বলে, তখন এসে বলে যে তোমার হাজবেন্ডকে যদি জিন্দা দেখতে চাও, ১০ লক্ষ টাকা দিতে হবে। আমি বলছি যে আমার বাড়িটা দেখেন, ১০ লক্ষ টাকা কি স্যার আমি ১০টাকাই কিভাবে দেব? আমার ঘরে ভাতের চাল পর্যন্ত নেই”, বিবিসিকে বলেন সেনুয়ারা বেগম।

সেনুয়ারা বেগম যে ওসি প্রদীপের কথা বলছেন, তিনি টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রদীপ কুমার দাশ, যাকে সম্প্রতি মেজর সিনহা নামে একজন সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে কক্সবাজারের আদালতে।

ওই হত্যাকাণ্ডের আগে থেকেই মি. দাশ কক্সবাজারে আলোচিত ছিলেন তার সময়ে হওয়া একের পর এক ক্রসফায়ারের জন্য।

সেনুয়ারা বেগম বলছিলেন, “কিন্তু উনি (প্রদীপ কুমার দাশ) এরকম করে যখন বলছে, আমি ১০/১৫দিন পর উনাকে টাকা দেই। উনি সেদিন সন্ধ্যার পর এসে আমার হাত থেকে টাকা নিছে, সাত লক্ষ টাকা। আমার স্বামী বিদেশে যাওয়ার জন্য টাকা রাখছিল সেটা, আর ভিটা-মাটি বন্ধক রেখে, ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে সব জমা করে উনাকে দেই।”

কিন্তু টাকা নেয়ার পরদিন থেকে সোনুয়ারা বেগমকে বলা হয় মি. জলিল পুলিশের কাছে নেই।

টেকনাফ থানার বাইরে প্রায় প্রতিদিন হাজির হয়ে স্বামীর বিষয়ে খোঁজ করতে থাকেন। প্রতিবার তাকে একই উত্তর দেয়া হয়।

২০২০ সালের ৭ই জুলাই স্থানীয় একজন সাংবাদিকের কাছ থেকে খবর পেয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে গিয়ে স্বামীর লাশ শনাক্ত করেন সেনুয়ারা বেগম।

লাশের সাথে দেয়া ছাড়পত্রে লেখা ছিল পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে মারা গেছেন মি. জলিল। মৃত আব্দুল জলিলের শরীরে বুলেটের চারটি ক্ষত ছিল।

এরপরও মামলা করতে পারেননি সেনুয়ারা বেগম।

পুলিশের মধ্যে যাচাই ও তদারকির অভাব

পুলিশের সাবেক কর্মকর্তারা মনে করেন, কোন থানা বা পুলিশ ফাঁড়িতে যখন অপরাধের অভিযোগ ওঠে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সে অভিযোগ যাচাই করে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়ার কথা, সেই কাজটি যথাযথভাবে হয় না অনেক সময়ই সেটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের একটি বড় কারণ।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক নুরুল হুদা বলছেন, সেটি করা গেলে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড কমে আসবে। তবে সেজন্য পুলিশ বাহিনীতে যোগ্য লোকের নিয়োগ পাওয়া এবং কর্মীদের তদারক ঠিকমত করার দিকে নজর দিতে হবে বলে তিনি বলছেন।

“সাধারণত পুলিশের হাতে ক্ষমতা থাকে, ক্ষমতা থাকলে ক্ষমতার অপব্যবহারও হয়, সারা পৃথিবীতেই। ঠিক মত লোকেদের যদি (পুলিশ বাহিনীতে) নিয়োগ না করা হয়, এবং তার যদি প্রশিক্ষণ ঠিক না হয়, তার তত্ত্বাবধান ঠিক না হয়—তাহলে বিচ্যুতি থেকে যাবে।”

“সেসব বিচ্যুতি ট্যাকেল করার জন্য বিভাগে আইনকানুন আছে। যেখানে ইন্টারনালি তাকে ডিসিপ্লিন করা যায়, করা হয়। যেখানে গর্হিত অপরাধ হয়, সেখানে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাও হয়। ফৌজদারি মামলা হয়ে পুলিশের চাকরিচ্যুতিও হয়। কিন্তু সমস্যা দূর করতে আমি বলব তত্ত্বাবধান এবং ঠিক মানসিকতার লোক নিয়োগ পাওয়া দরকার,” বলেন মি. হুদা।

পুলিশের আচরণে পরিবর্তন আসবে?

বিভিন্ন সময় অভিযোগ ওঠার পর পুলিশ সদস্যদের বিচার হওয়ার নজিরও তেমন দেখা যায় না। কিন্তু মেজর সিনহা হত্যা মামলার রায়ে পুলিশ বাহিনীর দুইজন সদস্যদের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে।

এই একটি ঘটনা কি পুলিশ বাহিনীর আচরণে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসবে?

মানবাধিকার কর্মী এবং অপরাধ বিজ্ঞানীরা অবশ্য তা মনে করেন না। তারা বলছেন এজন্য বড় ধরণের সংস্কার প্রক্রিয়া দরকার।

সুলতানা কামাল বলছেন, যদিও এটি পুলিশ বাহিনীর প্রতি একধরণের বার্তা দেবে, কিন্তু তারপরেও এই মামলাটি ছিল অন্য মামলার চেয়ে আলাদা।

তিনি বলেন, “একটা মামলার রায় সব কিছু পরিবর্তন বা শুদ্ধ করে দেবে সেটা আমরা আশা করেতে পারি না। কিন্তু এটা এক ধরণের বার্তা তো অবশ্যই দেবে যে অপরাধ করলে সেটা যদি ঠিকভাবে তদন্ত এবং বিচার হয় তাহলে পার পাওয়া যাবে না।”

“কিন্তু এখানে একটা ব্যাপার লক্ষণীয় যে বাদী হচ্ছেন একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার পরিবার, ফলে এখানে একটা ক্ষমতা কাঠামোর ব্যাপার আছে। তাছাড়া আসামির অপরাধ এতই বেশি ছিল যে এই এক ঘটনায় অনেক মানুষ বাদী পক্ষের পাশে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু সব মামলা এই রকম নয়।”

সংস্কারের কী ব্যবস্থা

বাংলাদেশে প্রায় দেড় দশক আগে পুলিশ বাহিনীতে পরিবর্তন আনার জন্য জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি সংস্কার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হয়েছিল।

কিন্তু তার ফল কতটা পাওয়া গেছে, তা নিয়ে সন্দেহাতীত কোন বিশ্লেষণ বা পরিসংখ্যান নেই।

এদিকে, পুলিশের অপরাধ নিয়ে এই বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কোন কর্মকর্তা মন্তব্য করতে রাজি হননি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানও অন-রেকর্ড মন্তব্য করেননি।

এখন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জবাবদিহিতার কথা বলা হলেও, কার্যত তার প্রতিফলন তেমন দেখা যায় না।

তবে বিভিন্ন সময় পুলিশ বাহিনীর পক্ষ দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে উদ্যোগ নেবার কথা বলা হয়েছে।

সেপ্টেম্বরে পুলিশে তিন হাজার কনস্টেবল নিয়োগের ঘোষণা দেয়ার সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনার বিষয়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

ক্রোয়েশিয়াকে হারিয়ে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছাতে চায় ব্রাজিল

কাতার বিশ্বকাপে আগামীকাল শুক্রবার দিনের ও টুর্নামেন্টের প্রথম কোয়ার্টার ফাইনালে ক্রোয়েশিয়ার মোকাবেলা করবে নেইমারের প্রত্যাবর্তনে আত্মবিশ্বাসী ব্রাজিল। শেষ ষোলর ম্যাড়মেড়ে পারফর্মেন্স করা ক্রোয়েশিয়াকে...

সরকার তৃণমূলে সাংস্কৃতিকভাবে মেধাবীদের মেধা বিকাশের কাজ করছে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর সরকার তৃণমূলে সাংস্কৃতিকভাবে মেধাবীদের মেধা বিকাশের উদ্যোগ নিয়েছে।তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যেসব সংস্কৃতিমনা মানুষ আছে তাদের...

মস্কো আগ বাড়িয়ে পরমাণু অস্ত্র ব্যবহার করবে না : পুতিন

ইউক্রেন যুদ্ধে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার নিয়ে উত্তেজনা বাড়ছে। তবে মস্কো আগ বাড়িয়ে তা ব্যবহার করবে না বলে জানিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন।পুতিন...

মিরাজের সেঞ্চুরিতে ভারতের বিপক্ষে টানা দ্বিতীয় ওয়ানডে সিরিজ জয় বাংলাদেশের

মেহেদি হাসান মিরাজের প্রথম সেঞ্চুরিতে ভারতের বিপক্ষে এক ম্যাচ বাকী রেখেই ওয়ানডে সিরিজ নিশ্চিত করলো বাংলাদেশ।আজ সিরিজের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে বাংলাদেশ ৫ রানে...

Recent Comments