30 C
Bangladesh
Sunday, July 25, 2021
Home স্বাস্থ্য লং কোভিড কী, কেন হয়, কী চিকিৎসা?

লং কোভিড কী, কেন হয়, কী চিকিৎসা?

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার কয়েক মাসের মধ্যেই ব্যাপারটা ব্রিটেনের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা খেয়াল করেছিলেন।

প্রথম দিকে বলা হয়েছিল, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ফলে শতকরা ৯০ জনের ক্ষেত্রেই সংক্ষিপ্ত এবং মৃদু অসুস্থতা দেখা দেয়, – জ্বর, কাশি, স্বাদ -গন্ধ না-পাওয়া ইত্যাদি – যা সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যেই সেরে যায়।

বলা হয়েছিল, শুধুমাত্র যাদের ওজন বেশি, বা যাদের ডায়াবেটিস, অ্যাজমা, হৃদরোগ ইত্যাদির মতো কোন স্বাস্থ্য সমস্যা আগে থেকেই আছে – তাদের জন্যই এটি বিপদ বা মৃত্যু-ঝুঁকির কারণ।

কিন্তু কিছুকাল বাদেই দেখা গেল – করোনাভাইরাস সংক্রমিতদের অনেকের জ্বর-কাশির মত উপসর্গগুলো সেরে গেলেও তারা পুরোপুরি সুস্থ হতে পারছেন না।
দেখা গেল, তাদের ফুসফুসের গুরুতর ক্ষতি হয়ে গেছে, অবসন্নতা ও বুক ধড়ফড়ানি দেখা দিচ্ছে, স্মৃতিশক্তি কমে গেছে, অনেকে এতটাই দুর্বল হয়ে পড়েছেন যে হাঁটাচলা পর্যন্ত করতে পারছেন না – স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসতে তাদের মাসের পর মাস সময় লাগছে, কাউকে কাউকে ফিজিওথেরাপি নিতে হচ্ছে।

ধীরে ধীরে বিজ্ঞানীদের কাছে এটা স্পষ্ট হলো যে এগুলো আসলে করোনাভাইরাস সংক্রমণেরই দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া – আর তখন থেকেই এই লং কোভিড কথাটা চালু হয়ে গেল।

যতই দিন যাচ্ছে ততই এটা আরো স্পষ্ট হচ্ছে যে যারা করোনাভাইরাস আক্রান্ত হচ্ছেন – তাদের অনেকের মধ্যেই লং কোভিড সমস্যা দেখা যাচ্ছে।

যারা প্রথম দফা ভাইরাস সংক্রমণে খুব একটা অসুস্থ হননি – তাদের মধ্যেও লং কোভিড হতে দেখা যাচ্ছে।

অনেকে আশংকা করছেন, যারা টিকা নেননি বা মাত্র এক ডোজ টিকা নিয়েছেন – তাদের মধ্যে বড় মাত্রায় লং কোভিড দেখা দিতে পারে।

লং কোভিডের লক্ষণগুলো কী?

যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নির্দেশিকা অনুযায়ী কেউ যদি করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর – তা গুরুতর বা মৃদু যাই হোকনা কেন – ১২ সপ্তাহ পার হয়ে গেলেও যদি রোগীর দেহে এমন অসুস্থতার লক্ষণ রয়ে যায়, যার কারণ হিসেবে অন্য কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যাচ্ছে না, তাহলে ধরে নিতে হবে তার ‘লং কোভিড’ হয়েছে।

ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্য সেবার তথ্য অনুযায়ী লক্ষণগুলো হচ্ছে:

১. চরম ক্লান্তি বা অবসন্নতা।

২. শ্বাস নিতে কষ্ট বা হাঁপিয়ে ওঠা, হৃৎপিণ্ডের ঘন ঘন স্পন্দন বা বুক ধড়ফড় করা, বুকে ব্যথা বা টানটান ভাব।

৩. স্মৃতি শক্তি বা মনঃসংযোগের সমস্যা – যাকে বলা হয় ‘ব্রেন ফগ’ বা বোধশক্তি ঝাপসা হয়ে যাওয়া।

৪. স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতিতে পরিবর্তন।

৫. হাড়ের জোড়ায় ব্যথা।

বিভিন্ন জরিপে রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী এই লং কোভিডের এ রকম শত শত লক্ষণ ও নানা অসুস্থতার অভিযোগ তালিকাভুক্ত হয়েছে।

তবে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত বৃহত্তম জরিপটি চালিয়েছে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন (ইউসিএল) এবং তারা লং কোভিডে আক্রান্ত লোকদের ১০টি প্রত্যঙ্গে আঘাত হানে এরকম ২০০টি লক্ষণ চিহ্নিত করেছেন।

দেখা গেছে যারা করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর পুরোপুরি সেরে উঠেছেন তাদের চাইতে লং কোভিডে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যেই এসব লক্ষণ বেশি দেখা গেছে।

এসব লক্ষণের মধ্যে আছে হ্যালুসিনেশন বা দৃষ্টিবিভ্রম, নিদ্রাহীনতা বা ইনসমনিয়া, শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, স্বল্প মেয়াদী স্মৃতি লোপ, কথা বলা ও ভাষার ক্ষেত্রে নানা সমস্যা দেখা দেয়া।

অনেকের ক্ষেত্রে পরিপাকতন্ত্র ও মূত্রাশয়ের সমস্যা দেখা দিয়েছে। নারীদের ক্ষেত্রে ঋতুস্রাব ও ত্বকের অবস্থায় পরিবর্তন দেখা গেছে।

এসব লক্ষণ কতটা গুরুতর হবে তা একেক রোগীর ক্ষেত্রে একেক রকম।

তবে অনেকের ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে লং কোভিডের কারণে তারা শাওয়ারে স্নান করা, দোকানে গিয়ে জিনিসপত্র কেনা বা কথা মনে রাখার মত কাজকর্ম করতে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।

লং কোভিডনিয়ে বাংলাদেশের রোগী ও ডাক্তাররা কী বলছেন?

বাংলাদেশে করোনাইরাস আক্রান্ত হবার পর সেরে উঠলেও মাসের পর মাস অসুস্থ ছিলেন এরকম কয়েকজনের সাথে কথা বলেছেন বিবিসি বাংলার সংবাদদাতা কাদির কল্লোল।

ঢাকায় গত বছর কোভিড-১৯ এর জন্য নির্ধারিত একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হন ৬৫ বছর বয়স্ক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা মর্তুজা আহমেদ ফারুক। কিন্তু তার পর দু’ মাস পেরিয়ে গেলেও মি: ফারুক কর্মক্ষমতা ফিরে পাননি।

“আমার এই দুর্বলতা দীর্ঘ সময় ধরে চলে। দেখা যাচ্ছে যে মাথা ঘোরে, শোয়া বা বসা থেকে উঠলে এবং হাঁটলে মাথা ঘোরে। এটা কিন্তু দু’মাস হওয়ার পরও রয়ে গেছে। যদিও বিশ্রামে আছি এবং যথেষ্ট প্রোটিন খাচ্ছি, তারপরও এই জিনিসটা যাচ্ছে না। সেজন্য আমি স্বাভাবিক কাজকর্ম করার জন্য এখনও ফিট নই” – বলেন তিনি।

ঢাকায় একজন টিভি সাংবাদিক মোঃ সাহাদাত হোসেন এবং তার স্ত্রী করোনাভাইরাসে গুরুতর অসুস্থ হয়ে নয় দিন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।

মি. হোসেনের বয়স ৩০ । তিনি বলছেন কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার তিন মাস পরও তিনি ভুলে যাওয়া বা স্মৃতিভ্রমের মতো সমস্যা অনুভব করছেন।

“খুবই শারীরিক দুর্বলতা অনুভব করি, এবং আমি হঠাৎ হঠাৎ স্মৃতি রিকল করতে সমস্যায় পড়ছি। ধরেন আমি ভাবলাম কাউকে ফোন করবো, কিন্তু যখন ফোন করতে যাই, তখন কাকে ফোন করতে চেয়েছিলাম, সেটা ভুলে যাই। আগে এ ধরণের কোন সমস্যা ছিল না।”

এ ব্যাপারে চিকিৎসকরাও বিবিসিকে বলেছেন, করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি পাওয়া অনেক মানুষ তাদের শরীরে নানা জটিলতা নিয়ে আবার হাসপাতালে যাচ্ছেন।

ঢাকায় মুগদা মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা: টিটো মিয়া তার অভিজ্ঞতা থেকে বলেছেন, মানসিক অবসাদ থেকে শুরু করে স্মৃতিভ্রমের মতো জটিল নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে সুস্থ হওয়া মানুষের শরীরে।

রোগীরা বলে, তারা মানসিক অবসাদে ভুগছেন, তাদের কিছু ভাল লাগছে না, কিছু করতে ইচ্ছা করছে না। কারও কারও হঠাৎ করে মনে হয়, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বা দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কারও কারও ফুসফুসে জটিলতা দেখা দেয়।”

“কেউ হার্ট এর সমস্যায় পড়েন, অনেক সময় কার্ডিয়াক ডেথও হয়ে যায়। হার্ট বিট কখনও স্লো হয়ে যায় বা খুব বেড়ে যায়। এছাড়া অনেকের ভুলে যাওয়াটা বেড়ে যায়।”

ভেন্টিলেটরে থাকা কোভিড রোগীদের চ্যালেঞ্জ

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে কোভিড-১৯ আক্রান্ত প্রতি ২০ জনের একজনের হয়তো নিবিড় পরিচর্যা বা ইনটেনসিভ কেয়ারে চিকিৎসা দরকার হতে পারে। এর মানে হলো, তাদের সংজ্ঞাহীন করে রাখা এবং ভেন্টিলেটর লাগানো।

রোগীকে যদি ইনটেনসিভ বা ক্রিটিকাল কেয়ারে থাকতে হয়, তাহলে তার সেরে উঠতেও সময় বেশি লাগবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে কোন রোগীকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ক্রিটিক্যাল কেয়ারে থাকতে হলে, তার পুরোপুরি সুস্থ হতে ১২ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত লাগতে পারে।

কারণ, হাসপাতালের বিছানায় দীর্ঘ সময় শুয়ে থাকলে মাংসপেশীর ভর কমে যায়, রোগী অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েন, এবং হারানো মাংসপেশী আবার তৈরি হতে অনেকটা সময় লাগে।

কোন কোন রোগীর হাঁটার ক্ষমতা ফিরে পেতে ফিজিওথেরাপি দরকার হয়। তা ছাড়া মানসিক সমস্যার সম্ভাবনাও থাকে।

কাজেই এই রোগ থেকে একজনকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে ডায়েটিশিয়ান, ফিজিওথেরাপিস্ট, স্পিচ এবং ভাষা থেরাপিস্ট এবং অকুপেশনাল থেরাপিস্ট সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে।

কোভিড-১৯ একসঙ্গে শরীরের বিভিন্ন অংশকে আক্রমণ করে বিকল করে দেয় বলে রোগীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলা এতবড় চ্যালেঞ্জ বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

“কোভিড একটা জঘন্য, সত্যিই জঘন্য রোগ। শরীরের সবকিছু এই ভাইরাস গ্রাস করে ফেলতে পারে” – বলছেন ইংল্যান্ডে প্লিমাথ শহরের ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের আইসিইউ ইউনিটের বিশেষজ্ঞ নার্স কেট ট্যানটাম।

কিন্তু শুধু যে আই সি ইউ তে থাকা রোগীরাই লং কোভিডে ভোগেন তা নয়।

যারা করোনাভাইরাস সংক্রমণের পর সামান্য অসুস্থ হয়েছেন – তাদেরও এটা হয়ে থাকে, এবং বর্তমানে ব্রিটেনে তরুণ বয়স্কদের মধ্যে লং কোভিড আক্রান্তের হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

লং কোভিডের কারণ কী?

এ ব্যাপারে এখনো সবকিছু নিশ্চিতভাবে জানেন না বিজ্ঞানীরা।

একটা সম্ভাব্য কারণের কথা বলা হচ্ছে। তা হলো, করোনাভাইরাস সংক্রমণ হলে তা ঠেকানোর জন্য কিছু লোকের ক্ষেত্রে তাদের রোগ-প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউন সিস্টেম অতিমাত্রায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। তা তখন শুধু ভাইরাসকে নয়, দেহের নিজস্ব টিস্যুকেও আক্রমণ করে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

ব্রিটেনে জলবায়ু আলোচনায় ৫১ দেশের অংশগ্রহণ

ব্রিটেন আয়োজিত জলবায়ু আলোচনায় বিশ্বের ৫১টি দেশের জলবায়ু ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রীরা অংশ নিচ্ছেন।গ্লাসগোয় নভেম্বরে যে সিওপি২৬ জলবায়ু বিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন হবে...

দাউদকান্দিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিতরণ

জেলার দাউদকান্দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর নির্মিত ঘর পরিদর্শন ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার...

তালেবান অগ্রযাত্রা রোধে আফগান সরকাররের রাত্রিকালীন কারফিউ জারি

আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তালেবানদের ব্যাপক আক্রমনের প্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা রোধে আফগান কর্তৃপক্ষ শনিবার দেশটির ৩৪ টি প্রদেশের মধ্যে ৩১...

লাল মিয়া থেকে বাংলাদেশের গণসঙ্গীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী

"ছেলেটার হাতে থাকতো একটা বাঁশি, পরনে সাদা, ঢোলা পায়জামা, পাঞ্জাবি। শুরুর দিকে একটু লাজুক ছিল। নাম জিজ্ঞেস করলাম, বললো লাল মিয়া, ওরফে...

Recent Comments