30 C
Bangladesh
Sunday, July 25, 2021
Home কোরআন সহীহ বুখারীর লাইলাতুল কদরের মর্যাদা

সহীহ বুখারীর লাইলাতুল কদরের মর্যাদা

লাইলাতুল কদর এর অর্থ অতিশয় সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত বা পবিত্র রজনী। আরবি ভাষায় ‘লাইলাতুল’ অর্থ হলো রাত্রি বা রজনী এবং ‘কদর’ শব্দের অর্থ সম্মান, মর্যাদা, মহাসম্মান। এ ছাড়া এর অন্য অর্থ হলো—ভাগ্য, পরিমাণ ও তাকদির নির্ধারণ করা।

ইসলাম ধর্ম অনুসারে, এ রাতে মুসলমান তথা ইসলামের মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) এর অনুসারীদের সম্মান বৃদ্ধি করা হয় এবং মানবজাতির ভাগ্য পুনর্নির্ধারণ করা হয়। কুরানের বর্ণনা অনুসারে, আল্লাহ এই রাত্রিকে অনন্য মর্যাদা দিয়েছেন এবং এই রাতে হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও অধিক সওয়াব অর্জিত হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

হাদিস অনুযায়ী, ২০ রমজানের পর যেকোনো বিজোড় রাতে কদর হতে পারে। তবে ২৬ রমজান দিবাগত রাতেই লাইলাতুল কদর আসে বলে আলেমদের অভিমত। আয়েশা থেকে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ আছে, মুহাম্মদ (সাঃ) রমজান মাসের শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমজানের শেষ ১০ রাতে শবে কদর সন্ধান করো। (বুখারি ও মুসলিম) আরেকটি হাদিসে মুহাম্মদ বলেছেন, মাহে রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে তোমরা শবে কদর সন্ধান করো।  (সহীহ বুখারী)

রাসূলুল্লাহর (সাঃ) আন্দোলন প্রতিরোধে উতবা কাফেরের ফন্দি

৬১০ সালে শবে কদরের রাতে মক্কার নূর পর্বতের হেরা গুহায় ধ্যানরত ইসলামের ধর্মের মহানবী, হযরত মুহাম্মদের সঃ নিকট সর্বপ্রথম কোরআন নাজিল হয়। কোন কোন মুসলমানের ধারণা তার নিকট প্রথম সূরা আলাক্বের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হয়। অনেকের মতে এ রাতে ফেরেশতা জীবরাইল এর নিকট সম্পূর্ন কোরআন অবতীর্ণ হয় যা পরবর্তিতে ২৩ বছর ধরে ইসলামের নবী মুহাম্মদের নিকট তার বিভিন্ন প্রয়োজনীয়তা এবং ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট আয়াত আকারে নাজিল করা হয়।

মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই রাত সর্ম্পকে হাদিস শরীফে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। এমনকি মুসলমানদের প্রধান ধর্মী গ্রন্থ আল কোরআনে সূরা ক্বদর নামে স্বতন্ত্র একটি পূর্ণ সুরা নাজিল হয়েছে। এই সুরায় শবে কদরের রাত্রিকে হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইসলাম ধর্ম মতে, মুহাম্মদ এর পূর্ববর্তী নবী এবং তাদের উম্মতগণ দীর্ঘায়ু লাভ করার কারণে বহু বছর আল্লাহর ইবাদাত করার সুযোগ পেতেন। কোরান ও হাদীসের বর্ণনায় জানা যায়, ইসলামের চার জন নবী যথা আইয়ুব, জাকরিয়া , হিযকীল ও ইউশা ইবনে নূন প্রত্যেকেই আশি বছর স্রষ্টার উপাসনা করেন এবং তারা তাদের জীবনে কোন প্রকার পাপ কাজ করেননি। কিন্তু মুহাম্মদ থেকে শুরু করে তার পরবর্তী অনুসারীগণের আয়ু অনেক কম হওয়ায় তাদের পক্ষে স্রষ্টার আরাধনা করে পূর্ববর্তীতের সমকক্ষ হওয়া কিছুতেই সম্ভপর নয় বলে তাদের মাঝে আক্ষেপের সৃষ্টি হয়। তাদের এই আক্ষেপের প্রেক্ষিতে তাদের চিন্তা দুর করার জন্য সুরা ক্বদর নাজিল করা হয় বলে হাদিসের বর্ণনায় জানা যায়।

মুসলমানদের কাছে শবে কদর এমন মহিমান্বিত বরকতময় এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত এ জন্য যে, এ রজনীতে মুসলমানদের পবিত্র গ্রন্থ ‘আল-কোরআন’ অবতীর্ণ হয়েছে। আল্লাহ কোরআনে ঘোষণা করেছেন,

নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জানো? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা আল-কদর, আয়াত ১-৫)

কদরের রাত্রের যাবতীয় কাজের ইঙ্গিত দিয়ে এ রজনীর অপার বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনের অন্যত্র ঘোষণা করেছেন,

হা-মীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের, নিশ্চয়ই আমি তা (কোরআন) এক মুবারকময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি, নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়। (সূরা আদ-দুখান, আয়াত: ১-৪)

ইসলাম ধর্ম মতে শবে কদরের রাতে ফেরেশতারা ও তাদের নেতা জিবরাঈল পৃথিবীতে অবতরণ করে উপাসনারত সব মানুষের জন্য বিশেষভাবে দোয়া করতে থাকেন। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে কদরে হজরত জিবরাঈল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট একদল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে তাঁদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (মাযহারি)

লাইলাতুল কদরে পরবর্তী এক বছরের অবধারিত বিধিলিপি ব্যবস্থাপক ও প্রয়োগকারী ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। এতে প্রত্যেক মানুষের বয়স, মৃত্যু, রিজিক, সবকিছুর পরিমাণ নির্দিষ্ট ফেরেশতাদেরকে লিখে দেওয়া হয়, এমনকি কে হজ্জ করবে, তা-ও লিখে দেওয়া হয়।

ইসলামের মহানবীকে তার স্ত্রী আয়েশা শবে কদর সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, হে রাসুলুল্লাহ! আমি যদি লাইলাতুল কদর পাই তখন কী করব? তখন নবী মত দেন, তুমি বলবে, হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, আপনি ক্ষমা করে দিতে ভালোবাসেন—অতএব, আমাকে ক্ষমা করুন। (তিরমিযি) মুসলমানদের ধারনায়, লাইলাতুল কদর গোটা মানবজাতির জন্য অত্যন্ত পুণ্যময় রজনী এবং এ রাত বিশ্ববাসীর জন্য স্রষ্টার অশেষ রহমত, বরকত ও ক্ষমা লাভের অপার সুযোগ এনে দেয়। এ রাতে কোরান শরীফ নাজিল হয় যার অনুপম শিক্ষাই ইসলামের অনুসারীদের সার্বিক কল্যাণ ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি, ইহকালীন শান্তি ও পারলৌকিক মুক্তির পথ দেখায়।

মরোক্কোতে কদরের রাতে বাচ্চাদের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়। মুসলিম অভিভাবকরা এ রাতে বাচ্চাদের জীবনের প্রথম রোজা রাখতে উদ্বুদ্ধ করে এবং নতুন পোশাক কিনে দেয়। মেহেদি দিয়ে তাদের হাত রাঙিয়ে দেন। রোজা রাখে না বলে বাচ্চাদের রমজান মাসে ডিম খেতে দেওয়া হয় না। শুধুমাত্র এ রাতে ডিম খেতে দেয়া হয়। এছাড়া বাচ্চাদের প্রথম রোজা রাখার পুরস্কার হিসেবে ‘কুসকুস’ খাবার রান্না করে মসজিদের দরজায় গরিব-মিসকিনদের দেয়া হয়।

আলজেরিয়াতেও এই রাতকে বাচ্চাদের প্রথম রোজা মনে করা হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের ঘরে বিশেষ ধরনের শরবত বানানো হয়। যেসব বাচ্চা নতুন রোজা রেখেছে তাদেরকে তা খাওয়ানো হয়। পানি, মিষ্টি ও ফুলের পানি দিয়ে তৈরি এই বিশেষ শরবতের পাত্রে এক টুকরো স্বর্ণ অথবার রুপার আংটি রাখা হয়।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -

Most Popular

দাউদকান্দিতে আশ্রয়ণ প্রকল্পে প্রধানমন্ত্রীর উপহার বিতরণ

জেলার দাউদকান্দিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কর্তৃক গৃহহীনদের জন্য আশ্রয়ন প্রকল্প-২ এর নির্মিত ঘর পরিদর্শন ও খাদ্য সামগ্রী বিতরণ করেছেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার...

তালেবান অগ্রযাত্রা রোধে আফগান সরকাররের রাত্রিকালীন কারফিউ জারি

আফগান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তালেবানদের ব্যাপক আক্রমনের প্রেক্ষিতে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা রোধে আফগান কর্তৃপক্ষ শনিবার দেশটির ৩৪ টি প্রদেশের মধ্যে ৩১...

লাল মিয়া থেকে বাংলাদেশের গণসঙ্গীতের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিল্পী

"ছেলেটার হাতে থাকতো একটা বাঁশি, পরনে সাদা, ঢোলা পায়জামা, পাঞ্জাবি। শুরুর দিকে একটু লাজুক ছিল। নাম জিজ্ঞেস করলাম, বললো লাল মিয়া, ওরফে...

দ্বৈতে বিদায় রোমান-দিয়ার, আন সান- কিম জে জুটির স্বর্ণজয়

আরচারি দ্বৈত ইভেন্টের মূল লড়াইয়ে পারলেন না বাংলাদেশের রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকী। নবম হয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেই বিদায় নিয়েছেন রোমান-দিয়া জুটি।টোকিওর...

Recent Comments