দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে চাপ ক্রমেই বাড়ছে। রপ্তানি আয় টানা কয়েক মাস ধরে নিম্নমুখী থাকলেও একই সময়ে আমদানি ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় রয়েছে। এতে রপ্তানি ও আমদানির ব্যবধান দ্রুত বেড়ে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ তীব্র হয়েছে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০২৫–২৬) প্রথম আট মাসে দেশের পণ্য বাণিজ্যে ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬.৯১ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৩.৭১ বিলিয়ন ডলার। এক বছরে ঘাটতি বেড়েছে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ২ লাখ কোটি টাকারও বেশি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত পণ্য রপ্তানি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৫৩৮ কোটি ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৪.৮৫ শতাংশ কম। জুলাই মাসে প্রবৃদ্ধি থাকলেও পরবর্তী সাত মাসে ধারাবাহিকভাবে রপ্তানি কমেছে। মার্চ মাসে রপ্তানি কমে দাঁড়ায় ৩৪৮ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১৮.৭ শতাংশ কম। এ পতনের পেছনে তৈরি পোশাক, চামড়া, হোম টেক্সটাইল, পাটজাত পণ্য ও প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্যের মতো প্রধান খাতগুলোর দুর্বল পারফরম্যান্সকে দায়ী করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আমদানি ব্যয় বেড়ে চলেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৬.১৪ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৫.৬ শতাংশ বেশি। একই সময়ে রপ্তানি আয় ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তা আমদানি ব্যয় বাড়াচ্ছে।
ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “এটি শুধু দেশীয় নয়, বৈশ্বিক সংকট। তবে উচ্চ সুদের হার ও জ্বালানি সংকট ব্যবসায়িক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলছে, ফলে আমদানি-রপ্তানিতে চাপ তৈরি হয়েছে।” বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং জ্বালানি সংকট অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। তিনি বাজেট ও মুদ্রা বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দেন।
তবে রেমিট্যান্স প্রবাহে কিছুটা স্বস্তি রয়েছে। চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ২২.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় বেশি। সব মিলিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভে আপাতত স্থিতিশীলতা থাকলেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন, রপ্তানি দুর্বলতা ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাণিজ্য ঘাটতির চাপ আরও বাড়তে পারে।