ইউরোপের বাজারে “মেড ইন বাংলাদেশ” ট্যাগ দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত ও দারিদ্র্যপীড়িত একটি দেশ কীভাবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকে পরিণত হলো—তার পেছনে রয়েছে লাখো শ্রমিকের পরিশ্রম, নারীর অংশগ্রহণ, উদ্যোক্তাদের সাহস এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি-অগ্রযাত্রা। তবে বৈশ্বিক বাণিজ্যের বর্তমান পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও ভারতের মধ্যে প্রস্তাবিত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এই চুক্তিকে “মাদার অব অল ডিলস” বলে অভিহিত করেছেন, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মত।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশই আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে, যার বড় অংশ যায় ইইউ বাজারে। বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) সুবিধার আওতায় শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেলেও ২০২৯ সালে বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের পর এই সুবিধা হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বর্তমান শূন্য শুল্ক সুবিধা ভবিষ্যতে ১০ থেকে ১২ শতাংশ শুল্কে রূপ নিতে পারে। অন্যদিকে, ভারত যদি ইইউর সঙ্গে এফটিএ বাস্তবায়ন করে স্থায়ী শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়, তবে বাংলাদেশের জন্য প্রতিযোগিতা আরও কঠিন হয়ে উঠবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে অর্ডার হ্রাস, কারখানা সংকোচন, শ্রমিক ছাঁটাই এবং বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
ভারতের শক্তিশালী ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্প—বিশেষ করে সুতা ও কাপড় উৎপাদনে স্বনির্ভরতা—তাদের জন্য রুলস অব অরিজিন পূরণ সহজ করবে। অন্যদিকে বাংলাদেশের অনেক শিল্প এখনো আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল, যা প্রতিযোগিতায় একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে হলে বাংলাদেশের শুধু কম খরচের উৎপাদন নয়, বরং শক্তিশালী শিল্পভিত্তি, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং কাঁচামালে স্বনির্ভরতা গড়ে তোলা জরুরি।
এদিকে ইইউর জিএসপি প্লাস সুবিধা অর্জনও বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। শ্রম অধিকার, পরিবেশ সুরক্ষা, সুশাসন ও মানবাধিকারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করতে হবে, যা বাস্তবায়নে কার্যকর অগ্রগতি দেখাতে হবে। বিশ্লেষকরা আরও বলছেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এখন সময়ের দাবি। ফার্মাসিউটিক্যালস, আইটি, লেদার, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও হালকা প্রকৌশল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে একক খাতনির্ভর অর্থনীতি বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এদিকে শিল্প খাতে নীতির ধারাবাহিকতা, জ্বালানি সংকট, বন্দর জট ও অবকাঠামোগত দুর্বলতাও প্রতিযোগিতাশক্তি কমিয়ে দিচ্ছে বলে উদ্যোক্তারা মনে করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২৯ সালের এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য এক ঐতিহাসিক মোড়। সঠিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে সম্ভাবনা যেমন তৈরি হবে, তেমনি অবহেলা করলে বড় ধরনের বাজার হারানোর ঝুঁকিও রয়েছে।