বিদ্যুৎ খাতে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে দেশে প্রিপেইড মিটার চালু করা হয়েছিল গ্রাহকসেবা সহজ করা, বকেয়া বিল কমানো এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারে গ্রাহকের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে। তবে বাস্তবে এই ব্যবস্থাকে ঘিরে নানা প্রশ্ন, অভিযোগ ও অসন্তোষ সামনে আসছে। ফলে অনেকেই জানতে চাইছেন, প্রিপেইড মিটার সত্যিই কতটা জনবান্ধব। প্রিপেইড মিটার ব্যবহারকারীদের অন্যতম প্রধান অভিযোগ হলো রিচার্জ করার পর সম্পূর্ণ অর্থ ব্যালেন্সে যোগ না হওয়া। গ্রাহকদের দাবি, নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ রিচার্জ করার পরও উল্লেখযোগ্য অংশ কমে যায়। বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এর পেছনে বকেয়া সমন্বয়, বিভিন্ন চার্জ ও কর কর্তনের ব্যাখ্যা দিলেও অনেক গ্রাহক মনে করেন, এসব কর্তনের তথ্য আরও স্পষ্টভাবে জানানো প্রয়োজন।
একই সঙ্গে অনেক পরিবার অভিযোগ করছে, আগের তুলনায় তাদের বিদ্যুৎ ব্যয় বেড়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন মিটারের নির্ভুলতা, ধাপভিত্তিক মূল্যহার এবং ব্যবহার পদ্ধতির পরিবর্তনের কারণে এমনটি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে জনমনে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের দাবি উঠছে। অস্বাভাবিক বা তথাকথিত ‘ভূতুড়ে বিল’ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক পরিমাণ বিলের অভিযোগ সামনে এসেছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা তথ্য সংক্রান্ত ভুলকে দায়ী করেছে, তবুও একই ধরনের অভিযোগের পুনরাবৃত্তি গ্রাহকদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করছে।
মিটার ক্রয় ও সরবরাহ প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপে আরও বেশি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের দাবি, সব কার্যক্রম বিদ্যমান বিধিমালা অনুসরণ করেই সম্পন্ন হয়েছে। প্রযুক্তিগত জটিলতাও অনেক ব্যবহারকারীর জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। ভুল কোড প্রবেশ, জরুরি সময়ে রিচার্জ করতে না পারা, মিটার লক হয়ে যাওয়া কিংবা অভিযোগ নিষ্পত্তিতে বিলম্বের মতো বিষয়গুলো সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তি বাড়িয়েছে। বিশেষ করে বয়স্ক ও প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ মানুষের জন্য এ ব্যবস্থা পরিচালনা করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।
ভোক্তা অধিকারকর্মী ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রিপেইড মিটার ব্যবস্থার ওপর স্বাধীন কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষা পরিচালনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি রিচার্জের অর্থ থেকে কী কী খাতে কত টাকা কর্তন হচ্ছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহককে জানানো, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি এবং প্রয়োজন হলে পুরো ব্যবস্থার কার্যকারিতা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তি তখনই সফল হয় যখন তা স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও জনস্বার্থ নিশ্চিত করে। তাই প্রিপেইড মিটার নিয়ে বিদ্যমান বিতর্ক দূর করতে তথ্যভিত্তিক তদন্ত, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং গ্রাহকবান্ধব সংস্কার এখন সময়ের দাবি।