পবিত্র মক্কা নগরীতে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছে বহুল আলোচিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’। চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে পুরো জোটের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন এক সমীকরণের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। রোববার (৯ আগস্ট) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
যৌথ বিবৃতিতে সামরিক সহায়তার বিস্তারিত কাঠামো প্রকাশ করা হয়নি। তবে তিন দেশের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা উদ্যোগকে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিরাপত্তা কাঠামোর পাশাপাশি নতুন একটি আঞ্চলিক শক্তির বলয় তৈরি হতে পারে। চুক্তির মাধ্যমে পাকিস্তানের জন্যও নতুন কৌশলগত অবস্থান তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা দেশটি এখন দক্ষিণ এশিয়া থেকে উপসাগরীয় অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত নিরাপত্তা সহযোগিতায় নিজেদের ভূমিকা জোরদার করতে চাইছে।
অন্যদিকে সৌদি আরব ও তুরস্কও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, তিন দেশের স্বার্থও অনেক ক্ষেত্রে একে অপরের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। সৌদি আরবের রয়েছে বিপুল অর্থনৈতিক সক্ষমতা, তুরস্কের রয়েছে উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি এবং পাকিস্তানের রয়েছে বড় সামরিক শক্তি ও পারমাণবিক সক্ষমতা। ফলে এই তিন শক্তির সমন্বয় একটি কার্যকর নিরাপত্তা অংশীদারত্বে রূপ নিতে পারে।
তবে এই চুক্তিকে ঘিরে ঝুঁকিও রয়েছে। ইরান ইতোমধ্যে এর সমালোচনা করেছে। তেহরানের আশঙ্কা, নতুন এই প্রতিরক্ষা কাঠামো ভবিষ্যতে ইরানকে লক্ষ্য করে গড়ে উঠতে পারে। বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, ইরানের সঙ্গে পাকিস্তান ও তুরস্কের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে কোনো আঞ্চলিক সংঘাতে জোটের সদস্য হিসেবে পাকিস্তান জড়িয়ে পড়লে দেশটির জাতীয় স্বার্থ ও কূটনৈতিক ভারসাম্য প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক করছেন কেউ কেউ। সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে যদি সরাসরি ইরানবিরোধী জোট হিসেবে দেখা হয়, তাহলে দেশটির শিয়া জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এদিকে এই প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রভাব ভারত ও ইসরায়েলেও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ভারত ঘটনাপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানিয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা পাকিস্তানের সামরিক ও পারমাণবিক সক্ষমতার সঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা শক্তির সমন্বয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
সব মিলিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি শুধু তিন দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা সহযোগিতা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের ভূরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের সূচনা করতে পারে। ভবিষ্যতে আরও কোনো দেশ এই কাঠামোয় যুক্ত হয় কি না এবং চুক্তিটি বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।