সদ্য প্রকাশিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে ইংরেজি ও গণিতে শিক্ষার্থীদের খারাপ ফলের পেছনে দক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের সংকটকে অন্যতম বড় কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদরা। দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষক নিজ নিজ বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়াই এসব বিষয় পড়াচ্ছেন বলে উঠে এসেছে সরকারি তথ্য-উপাত্তে। বাংলাদেশ শিক্ষা-তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে গণিতের শিক্ষক রয়েছেন ৬৪ হাজার ১৪৭ জন। এর মধ্যে গণিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মাত্র ১৩ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৮৭ শতাংশ শিক্ষক গণিতে উচ্চতর ডিগ্রি ছাড়াই শিক্ষার্থীদের বিষয়টি পড়াচ্ছেন।
শিক্ষাবিদদের মতে, এর প্রভাব সরাসরি পড়ছে শিক্ষার্থীদের শেখার ওপর। অনেক ক্ষেত্রে গণিত শেখানোর পদ্ধতি হয়ে উঠছে মুখস্থনির্ভর। ফলে প্রশ্নের ধরন বা পদ্ধতিতে সামান্য পরিবর্তন এলেই শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ে যাচ্ছে। এতে গণিতের মৌলিক ধারণা ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা গড়ে উঠছে না। ইংরেজি বিষয়েও প্রায় একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজির শিক্ষক রয়েছেন ৬০ হাজার ৮৫৭ জন। তাদের মধ্যে ইংরেজিতে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মাত্র ৯ হাজার ৩৭৬ জন, যা মোট শিক্ষকের ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। অর্থাৎ প্রায় ৮৫ শতাংশ ইংরেজি শিক্ষক অন্য বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকের ঘাটতি দীর্ঘদিনের সমস্যা। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাবে শিক্ষার্থীদের শিখন ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। যারা বাড়তি অর্থ খরচ করে ব্যক্তিগত পড়াশোনা বা কোচিংয়ের সুযোগ নিতে পারছে, তারা কিছুটা এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীরা আরও বেশি পিছিয়ে পড়ছে। এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৯ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার দেখা গেছে। মোট পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। সরকারের পক্ষ থেকে আগের বছরগুলোর ফলকে তুলনামূলক বেশি নম্বর দেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত করা হলেও শিক্ষকরা আরও কয়েকটি কারণের কথা বলছেন।
তাদের মতে, নবম ও দশম শ্রেণিতে আলাদা শিক্ষাক্রমে পাঠদান, পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তি ও যন্ত্রনির্ভরতায় অতিরিক্ত আসক্তি এবং সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন পরিবর্তনও ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে। এবার জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ২০২২ সালে সর্বোচ্চ ২ লাখ ৬৯ হাজার ৬০২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছিল। চলতি বছর সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৬৭৬ জনে।
শিক্ষকদের মতে, উচ্চশিক্ষা থেকে শুরু করে চাকরির পরীক্ষা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ইংরেজি ও গণিতের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। অথচ এই দুটি বিষয়েই শিক্ষার্থীদের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। তাই শুধু পরীক্ষার ফল নিয়ে আলোচনা না করে দক্ষ শিক্ষক নিয়োগ, বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং শ্রেণিকক্ষে কার্যকর পাঠদানের দিকে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। এদিকে দেশের কিছু বেসরকারি ও নন-এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানে অতীতে নিয়োগ পাওয়া এমন শিক্ষকও রয়েছেন, যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা উচ্চ মাধ্যমিক বা সমমান পর্যন্ত। বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষক নিয়োগে উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজন হলেও পুরোনো নিয়োগের কারণে কিছু ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি এখনো বিদ্যমান।
সব মিলিয়ে এবারের এসএসসি ফলাফল আবারও প্রশ্ন তুলেছে—শুধু শিক্ষার্থীদের মেধা বা পরিশ্রমের ঘাটতিই কি খারাপ ফলের কারণ, নাকি বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক সংকটও এর বড় কারণ? শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষার মান উন্নয়নে এই প্রশ্নের সমাধান এখন অত্যন্ত জরুরি।