মাথা ও মস্তিষ্কের জটিল রোগের চিকিৎসায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে। হাসপাতালের নতুন ৫০০ শয্যার ভবন উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে মোট শয্যা সংখ্যা এক হাজারে উন্নীত হলো। শনিবার সকাল ১০টায় হাসপাতালের সম্প্রসারিত ভবন উদ্বোধন করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দক্ষিণ এশিয়ায় এত বড় নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল আর নেই।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন মাথায় আঘাত, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, স্ট্রোক, টিউমার, মৃগীসহ নানা ধরনের স্নায়বিক জটিলতায় আক্রান্ত রোগীরা এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। বর্তমানে বহির্বিভাগে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। পাশাপাশি ২৪ ঘণ্টার জরুরি বিভাগেও বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ থাকে। রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় পুরোনো ভবনের ৫০০ শয্যা দিয়ে চিকিৎসাসেবা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ কারণে ২০১৯ সালে ১৫ তলা নতুন ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। ২০২৫ সালে ভবনটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
নতুন ভবনটিতে মাটির নিচে তিনটি এবং ওপরে ১২টি তলা রয়েছে। সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই ভবনে রাখা হয়েছে আধুনিক চিকিৎসা ও পরীক্ষার ব্যবস্থা। নতুন নিউরোলজিক্যাল ল্যাবে এমন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা হয়েছে, যার মাধ্যমে মাথা না কেটে রক্তনালির পথ ব্যবহার করে মস্তিষ্কের জটিল চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হবে। দুটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংবলিত আধুনিক এমআরআই যন্ত্রও স্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া দুটি অত্যাধুনিক ডুয়েল সিটি স্ক্যান যন্ত্র রয়েছে, যার মাধ্যমে মাত্র ৩০ সেকেন্ডে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব। আলট্রাসনোগ্রাম, এক্স-রেসহ বিভিন্ন পরীক্ষার জন্যও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। হাসপাতালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর চিকিৎসাসেবার সঙ্গে এই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান তুলনা করা যায়। তার দাবি, দক্ষিণ এশিয়ায় এটি এখন সবচেয়ে বড় নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতাল।
নতুন ভবন নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনার জন্য মোট ৫০৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কাজ ও যন্ত্রপাতি কেনা শেষে হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করতে গিয়ে ১৩ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে বলেও জানান তিনি। হাসপাতালের পরিচালক ও নিউরোসার্জন অধ্যাপক ডা. মো. নুরুজ্জামান খান খসরু বলেন, নতুন ভবন চালু হলে নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসাসেবার পরিধি প্রায় দ্বিগুণ হবে। ফলে রোগীরা আগের তুলনায় দ্রুত ভর্তি, পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ পাবেন।
তিনি বলেন, স্নায়বিক রোগের চিকিৎসা অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান। এতে বিপুল অর্থ দেশের বাইরে চলে যায়। দেশে আধুনিক চিকিৎসাসেবা আরও বিস্তৃত করা গেলে বিদেশমুখী রোগীর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। ঢাকার বাইরে নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। পুরোনো কয়েকটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে থাকা নিউরোলজি ওয়ার্ডগুলোকে কেন্দ্র করে ছোট পরিসরের বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বিভাগীয় পর্যায়ে নিউরো সায়েন্সেস চিকিৎসা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
তার মতে, সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি চিকিৎসা খাতকেও এই ক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারত্বের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক স্নায়ুরোগ চিকিৎসার সুযোগ তৈরি করা গেলে রোগীদের চিকিৎসার জন্য ঢাকায় কিংবা বিদেশে ছুটতে হবে না। প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে আগারগাঁওয়ে নিউরো সায়েন্সেস হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরে ২০১২ সালে ১০ তলা ভবনে ৩০০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে এর কার্যক্রম শুরু হয়। রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় পরবর্তী সময়ে আরও ২০০ শয্যা যুক্ত করা হয়। এবার নতুন ভবনের ৫০০ শয্যা যুক্ত হওয়ায় হাসপাতালটির মোট শয্যা সংখ্যা দাঁড়াল এক হাজারে।