দেশে হৃদরোগ, ক্যানসার, স্ট্রোক, ডায়াবেটিস, কিডনি রোগ ও স্থূলতাসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এসব রোগে মৃত্যুর সংখ্যাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব রোগের ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম কারণ ক্ষতিকর ট্রান্স ফ্যাট। সম্প্রতি তেজগাঁওয়ে বিএসটিআইয়ের প্রধান কার্যালয়ে খাদ্যপণ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটি অ্যাসিড নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসব তথ্য তুলে ধরেন। জাতীয় হৃদরোগ ফাউন্ডেশন ও বিএসটিআইয়ের যৌথ উদ্যোগে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, ট্রান্স ফ্যাট শরীরে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়ায় এবং উপকারী কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে এটি রক্তনালির ক্ষতি করে হৃদ্রোগ, হার্ট অ্যাটাক ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। পাশাপাশি শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। আইসিডিডিআরবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আলিয়া নাহিদ বলেন, একই তেল বারবার ব্যবহার করলে ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ বেড়ে যায়। এ ধরনের তেলে তৈরি খাবার নিয়মিত খেলে বিভিন্ন গুরুতর রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ভোজ্য তেল, বনস্পতি, ঘিসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্য তৈরিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, ট্রান্স ফ্যাটের কারণে শরীরে নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাট থাকলে হৃদরোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। রক্তনালি বন্ধ হয়ে গুরুতর শারীরিক জটিলতাও দেখা দিতে পারে। হার্ট ফাউন্ডেশনের অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী খাদ্যে শিল্পোৎপাদিত ট্রান্স ফ্যাটের পরিমাণ মোট চর্বির দুই শতাংশের নিচে রাখা উচিত। কিন্তু দেশের অনেক খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এই নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঝুঁকিপূর্ণ খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলে ট্রান্স ফ্যাটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. গোলাম কিবরিয়া জানান, ভোজ্য তেলে কত পরিমাণ ট্রান্স ফ্যাট রয়েছে, তা যথাযথভাবে মান নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা জরুরি। অতিরিক্ত ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত তেল ব্যবহারে লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গের জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এদিকে শিশু ও গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও ট্রান্স ফ্যাটকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক মুসাররত সুলতানা সুমি বলেন, ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার গর্ভবতী মা ও গর্ভের শিশুর স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিশু হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মির্জা মো. জিয়াউল ইসলামও শিশুদের জন্য ট্রান্স ফ্যাটকে বিপজ্জনক হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, শিশুদের খাদ্যতালিকায় এ ধরনের ক্ষতিকর চর্বি নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা জানান, লাচ্ছা সেমাই, সাজানো কেক, চিপস, চানাচুর, পিজ্জা, বার্গারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত ও ফাস্টফুডে ট্রান্স ফ্যাট থাকতে পারে। তাই খাদ্য কেনার ক্ষেত্রে উপাদান ও মান সম্পর্কে সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর উপাদানের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা গেলে অসংক্রামক রোগে আক্রান্তের সংখ্যা কমানো সম্ভব। এ জন্য জনসচেতনতার পাশাপাশি অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যপণ্যে ট্রান্স ফ্যাটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিয়মিত মান পরীক্ষা ও বাজার তদারকি জোরদার করা গেলে হৃদরোগসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।