নেপালের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। উদ্ধার কার্যক্রম চলতে থাকায় প্রতিদিনই বাড়ছে মরদেহের সংখ্যা। ভাটির বিভিন্ন জেলা থেকে একের পর এক মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় হাসপাতাল ও মর্গগুলোতে এখন আর পর্যাপ্ত জায়গা নেই। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই দিনে প্রায় চার হাজার মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে শতাধিক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। তবে এখনো অন্তত ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। সব মিলিয়ে নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি।
গত বুধবার সকালে নেপাল-চীন সীমান্তের কাছাকাছি রাসুয়া জেলার তিমুর ও স্যাফ্রুবেশি এলাকায় ভোতেকোশি নদীতে আকস্মিক প্রবল বন্যা দেখা দেয়। উজান থেকে পানির সঙ্গে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীতীরবর্তী জনপদগুলোতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। বন্যার স্রোতে সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে প্রবল স্রোতের পানি ত্রিশূলী নদীতে গিয়ে পড়ায় ভাটির বিস্তীর্ণ এলাকায়ও এর প্রভাব পড়ে। ভেসে যায় মানুষ, যানবাহন ও স্থাপনা। এমনকি মরদেহ ও মানবদেহের বিভিন্ন অংশও মূল দুর্যোগকবলিত এলাকা থেকে বহু দূরের জেলাগুলোতে পৌঁছে যায়।
নেপালের সংবাদমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, রাসুয়া ও নুয়াকোট থেকে ভেসে যাওয়া মরদেহ ভাটির চিতওয়ান, তানাহুন, নওয়ালপরাসি, গোর্খাসহ বিভিন্ন এলাকায় পাওয়া যাচ্ছে। ফলে এসব এলাকার হাসপাতালের মর্গে মরদেহ রাখার জায়গা প্রায় শেষ হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে চিতওয়ানে অস্থায়ী মরদেহ সংরক্ষণ কেন্দ্র তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ভরতপুর নগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের বিদ্যুৎ রোডে একটি অব্যবহৃত ভবনকে অস্থায়ী সংরক্ষণ কেন্দ্রে রূপান্তর করা হচ্ছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চিতওয়ানের হাসপাতালগুলোর মর্গে সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৫০টি মরদেহ রাখা সম্ভব। নতুন অস্থায়ী কেন্দ্রে প্রায় ২৫০টি মরদেহ সংরক্ষণ করা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের এক দিনে ত্রিশূলী ও নারায়ণী নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায় ১৩৭টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান এখনো অব্যাহত রয়েছে।
অস্থায়ী কেন্দ্রেও জায়গা শেষ হয়ে গেলে বিকল্প হিসেবে দেবঘাটের বৈদ্যুতিক শ্মশান ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছে কর্তৃপক্ষ। মরদেহ সংরক্ষণের জন্য কক্ষের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং পচন ঠেকাতে শুকনো বরফ ব্যবহারের প্রস্তুতিও নেওয়া হচ্ছে। একই পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে পোখারাতেও। তানাহুন, গোর্খা, পূর্ব নওয়ালপরাসি ও ধাদিং জেলা থেকে ৯৩টি মরদেহ পোখারায় নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে হাসপাতালগুলোর সম্মিলিতভাবে প্রায় ৮৮টি মরদেহ রাখার সক্ষমতা রয়েছে।
পোখারা একাডেমি অব হেলথ সায়েন্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় মরদেহগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এতে সাধারণত ১০ দিন থেকে দুই সপ্তাহ পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণ করা সম্ভব। এর বেশি সময় রাখতে হলে হিমাঙ্কের নিচে তাপমাত্রা বজায় রাখার বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হবে। এদিকে নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে রসুয়া, নুয়াকোট, গোর্খাসহ বিভিন্ন জেলা থেকে মানুষ চিতওয়ান ও অন্যান্য এলাকায় ভিড় করছেন। মরদেহ শনাক্তের পাশাপাশি অজ্ঞাত ও দাবিহীন মরদেহ ব্যবস্থাপনার প্রস্তুতিও নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
কাসকি জেলার পুলিশ সুপার নবীন কার্কি জানিয়েছেন, অজ্ঞাত মরদেহ অনির্দিষ্টকাল সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। স্বজনদের সন্ধান না পাওয়া গেলে নির্ধারিত স্থানে দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করা হবে। তবে প্রতিটি মরদেহে আলাদা শনাক্তকারী নম্বর দেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে পরিচয় শনাক্ত হলে দাফন বা সৎকারের তথ্য কাজে লাগানো যায়। এদিকে রাসুয়ার ভোতেকোশি নদীতে আবারও পানি বাড়তে শুরু করায় ভাটির এলাকাগুলোর জন্য সতর্কতা জারি করেছে নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। ফলে নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় নদীতীরবর্তী এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।