জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বামী মো. জসিম উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দেওয়ার কারণে তার বড়

জুলাই আন্দোলনে স্বামী নিহত, স্ত্রী জবানবন্দি দেওয়ায় মেয়েকে ধর্ষণ করে আওয়ামী লীগ নেতারা

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৪০ সময় , আপডেট সময় : ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১২:৪০ সময়

জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বামী মো. জসিম উদ্দিনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত সংস্থার কাছে জবানবন্দি দেওয়ার কারণে তার বড় মেয়ে লামিয়াকে ধর্ষণ করা হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন নিহত জসিমের স্ত্রী রুমা বেগম। তার দাবি, ধর্ষণের ঘটনা ছড়িয়ে পড়ার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে লামিয়া আত্মহত্যা করেন। সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীর একক বেঞ্চে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আওয়ামী লীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপসসহ ২৮ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় এসব কথা বলেন রুমা।


পটুয়াখালীর দুমকি উপজেলার বাসিন্দা রুমা একজন গৃহিণী। তার স্বামী জসিম একটি প্রতিষ্ঠানে চালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। রুমার ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন জসিম। তখন তারা রাজধানীর আদাবরের শেখেরটেক এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। রুমা জানান, ওই দিন ধাওয়া খেয়ে আহত অবস্থায় বাসায় ফিরেছিলেন জসিম। তার গাড়িটি ধানমন্ডির কোনো একটি এলাকায় রেখে এসেছিলেন। পরদিন ১৯ জুলাই জুমার নামাজ পড়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আর ফিরে আসেননি তিনি। পরে তার মোবাইল ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।


সন্ধ্যার দিকে প্রতিবেশী কোহিনুর বেগম এসে জানান, তার ছেলে উজ্জল ফোন করে বলেছেন, আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে জসিম সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পড়ে আছেন। খবর পেয়ে চাচাশ্বশুর সালাম গাজীকে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হন রুমা। পথে পুলিশ তাদের বাধা দেয় বলে তিনি সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন। হাসপাতালে গিয়ে অপারেশন থিয়েটারের সামনে একটি ট্রলিতে রক্তাক্ত অবস্থায় স্বামীকে দেখতে পান বলে জানান রুমা। তার ভাষ্য, তখনও জসিমের জ্ঞান ছিল। গুলিতে তার দুটি আঙুল উড়ে যায় এবং বুকে গুলি লাগে। বুক দিয়ে ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া গুলির ক্ষত থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল বলেও তিনি জানান।


রুমার দাবি, জসিম তাকে জানিয়েছিলেন, জুমার নামাজ শেষে আন্দোলনে যোগ দিতে তিনি মোহাম্মদপুরের আল্লাহ করিম মসজিদের সামনে গিয়েছিলেন। সেখানে পুলিশ ও ছাত্রলীগের গুলিতে তিনি আহত হন। রুমা জানান, হাসপাতালে সাইফুল নামে এক আন্দোলনকারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তার দাবি, সাইফুলই জসিমকে হাসপাতালে নিয়ে এসেছিলেন। অস্ত্রোপচারের জন্য রক্ত প্রয়োজন হলে সাইফুল টাকা দিয়ে দুই ব্যাগ রক্তের ব্যবস্থা করেন।


সেদিন বিপুলসংখ্যক গুলিবিদ্ধ মানুষ হাসপাতালে আসায় চিকিৎসক ও নার্সদের চাপের মধ্যে চিকিৎসাসেবা দিতে হয় বলে জানান রুমা। রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে জসিমের অস্ত্রোপচার শেষ হয়। এরপর তাকে পর্যবেক্ষণ কক্ষে রাখা হয়। পরদিন জসিমের শরীর থেকে রক্ত বের হতে দেখে তার হাতের ব্যান্ডেজ খুলে দুটি আঙুল না থাকার বিষয়টি দেখতে পান বলে জানান রুমা। চিকিৎসকরা জানান, আঙুলগুলো গোড়া থেকে কেটে ফেলতে হবে। ২১ জুলাই অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তার দুটি আঙুল কেটে ফেলা হয়।


২২ জুলাই জসিমের অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে নেওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে এ ধরনের শয্যা না থাকায় মহাখালীর বক্ষব্যাধি হাসপাতালে একটি শয্যার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে জসিমের বুকে আরেকটি অস্ত্রোপচার করা হয়। রুমার দাবি, এরপর আর জ্ঞান ফেরেনি তার স্বামীর। পরে তার অনুরোধে জসিমকে জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রে রাখা হয়। ২৯ জুলাই রাত আনুমানিক ৯টার দিকে তিনি মারা যান।


মরদেহ হস্তান্তর নিয়েও জটিলতার মুখে পড়ার কথা জানান রুমা। তার ভাষ্য, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশি ছাড়পত্র ছাড়া মরদেহ দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এরপর বনানী থানায় গেলে তাকে মোহাম্মদপুর থানায় যেতে বলা হয়। আবার মোহাম্মদপুর থানায় গেলে সেখানে গুলির ঘটনা ঘটেনি বলে তাকে বনানী থানায় পাঠানো হয়। রুমার দাবি, ২৯ জুলাই রাত থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত তাকে দুই থানায় একাধিকবার যেতে হয়। পরে হাসপাতালের পরিচালকের কাছে গেলে তিনি বনানী ও মোহাম্মদপুর থানায় দুটি চিঠি দেন। এরপর বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাকে ‘ওপর মহলের হুকুমে’ ছাড়পত্র দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানান বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন রুমা।


পরে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন তিনি। রুমার দাবি, মামলা না করলে মরদেহ দেওয়া হবে না বলে তাকে জানানো হয়েছিল। সব জটিলতা শেষে ৩১ জুলাই স্বামীর মরদেহ হাতে পান তিনি। পরে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে জসিমকে দাফন করা হয়। স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় কারা জড়িত, সে বিষয়ে পরে বিভিন্ন ভিডিও, সংবাদ প্রতিবেদন ও স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার কথা জানান রুমা। তার অভিযোগ, শেখ হাসিনা, শেখ ফজলে নূর তাপস ও জাহাঙ্গীর কবির নানকের নির্দেশে পুলিশ কর্মকর্তা, আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিরা জসিমকে হত্যার ঘটনায় জড়িত ছিলেন।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে কয়েকজনকে অস্ত্র হাতে গুলি করতে দেখেছেন বলেও দাবি করেন রুমা। একজনকে চাপাতি হাতে দেখেছেন বলে সাক্ষ্যে উল্লেখ করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় নির্ধারিত হবে। রুমা জানান, ২০২৫ সালের ১৭ মার্চ স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দিতে তিনি ঢাকায় আসেন। সঙ্গে ছিলেন তার ভাই বেলাল মৃধা, মেজো মেয়ে বুশরা ও ছোট ছেলে জুবায়ের ইসলাম। বড় মেয়ে লামিয়া তখন দুমকি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী হওয়ায় তাকে বাড়িতে রেখে আসেন।


রুমার সাক্ষ্য অনুযায়ী, ১৮ মার্চ লামিয়া বাবার কবর জিয়ারত করে বাড়ি ফেরার পথে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন। তার দাবি, তিনি স্বামীর হত্যার ঘটনায় ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে ঢাকায় আসার কারণেই মেয়েকে লক্ষ্য করে এই ঘটনা ঘটানো হয়। রুমা আরও বলেন, ধর্ষণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর লামিয়া মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। পরে তিনি আত্মহত্যা করেন। এ কথা বলতে গিয়ে ট্রাইব্যুনালে কান্নায় ভেঙে পড়েন রুমা। একইসঙ্গে স্বামী জসিম উদ্দিনের হত্যার বিচারও দাবি করেন তিনি।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯