একসময় যেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা, আজ সেখানে নেমে এসেছে

অস্তিত্বসংকটে ঈশ্বরদীর বেনারসিপল্লি

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:২৭ সময় , আপডেট সময় : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:২৭ সময়

একসময় যেখানে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত তাঁতের খটখট শব্দে মুখর থাকত পুরো এলাকা, আজ সেখানে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা। শত শত তাঁত, হাজারো কারিগর আর বেনারসি শাড়ির জমজমাট ব্যবসা—সবই যেন এখন অতীতের গল্প। পাবনার ঈশ্বরদীর ঐতিহ্যবাহী বেনারসি পল্লি আজ অস্তিত্বসংকটে। কিন্তু কেন হারিয়ে যাচ্ছে এই শিল্প? আর এর পেছনে কতটা দায় কম দামের মেশিনে তৈরি ভারতীয় শাড়ির?


পাবনার ঈশ্বরদীর বেনারসি পল্লির ইতিহাস একশ বছরেরও বেশি পুরোনো। ব্রিটিশ আমলে ভারত থেকে আসা কারিগরদের হাত ধরে এখানে কাতান ও বেনারসি শাড়ি তৈরির ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহু পরিবার এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। একসময় ঈশ্বরদীর এই এলাকায় কয়েক হাজার কারিগর কাজ করতেন। শতাধিক তাঁতঘরে দিন-রাত চলত শাড়ি তৈরির কাজ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। এখন অধিকাংশ তাঁতঘর বন্ধ। হাতে গোনা কয়েকটি কারখানা কোনোভাবে টিকে আছে।


তাঁতশিল্পকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড ঈশ্বরদীর ফতেমোহাম্মদপুর এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপর বেনারসি পল্লি প্রতিষ্ঠা করে। প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা এই পল্লিতে ৯০ জন তাঁতিকে ৯০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত বড় উদ্যোগের পরও বাস্তবে মাত্র সাতটি প্লটে কারখানা স্থাপন করা হয়। বর্তমানে সেগুলোরও হাতে গোনা কয়েকটি চালু রয়েছে। ফলে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে গড়ে ওঠা বেনারসি পল্লির বড় অংশই এখন অনেকটা পরিত্যক্ত ও নীরব।


কারিগর ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে কম দামের মেশিনে তৈরি ভারতীয় শাড়ির দাপট বেড়ে যাওয়ায় দেশীয় হাতে বোনা বেনারসির চাহিদা কমেছে। মেশিনে দ্রুত এবং তুলনামূলক কম খরচে শাড়ি তৈরি করা সম্ভব। অন্যদিকে একটি হাতে বোনা শাড়ি তৈরি করতে সময় ও শ্রম দুটোই বেশি লাগে। ফলে দামের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশীয় তাঁতশিল্প।


একজন তাঁত মালিক জানিয়েছেন, একসময় ঈশ্বরদীতে প্রায় এক হাজার তাঁত ছিল। এখন সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টির মতো। সরকারি সহায়তা, সহজ কিস্তিতে ঋণ এবং বাজার সুবিধা পেলে এই শিল্পকে আবারও ঘুরে দাঁড় করানো সম্ভব বলে মনে করছেন তাঁরা। শুধু বাজারের প্রতিযোগিতাই নয়, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং দক্ষ কারিগরের সংকটও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন প্রজন্মের অনেকেই আর তাঁতের কাজকে পেশা হিসেবে নিতে চাইছেন না। ফলে পুরোনো কারিগররা সরে গেলে এই শিল্পের দক্ষতাও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।


ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, হাতে বোনা শাড়ির আলাদা ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য থাকলেও বেশি সময় এবং শ্রমের কারণে এর উৎপাদন ব্যয়ও বেশি। তাই কম দামের মেশিনে তৈরি শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ঐতিহ্যের কথা বলে ঈশ্বরদীর বেনারসি শিল্পকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের সমন্বয়। পাশাপাশি সহজ শর্তে ঋণ, কারিগরদের প্রশিক্ষণ, কাঁচামালের সহজলভ্যতা এবং দেশীয় বাজারে কার্যকর সহায়তা দরকার।


দেশীয় বেনারসির প্রচার বাড়ানো এবং নতুন বাজার তৈরি করাও জরুরি বলে মনে করছেন তাঁত মালিক ও ব্যবসায়ীরা। কারণ এই শিল্প হারিয়ে গেলে শুধু একটি শাড়ি তৈরির ঐতিহ্য হারাবে না। এর সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের কারিগরি দক্ষতা এবং বহু পরিবারের জীবিকার পথ। তাই এখন প্রশ্ন একটাই—ঈশ্বরদীর ঐতিহ্যবাহী বেনারসি পল্লিতে আবার কি ফিরবে সেই তাঁতের খটখট শব্দ, নাকি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের পাতাতেই হারিয়ে যাবে শত বছরের এই তাঁতশিল্প?

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯