মাত্র কয়েক মাস পরই নতুন শিক্ষাবর্ষ। শিক্ষার্থীদের হাতে সময়মতো বই তুলে দিতে চলছে ২০২৭ সালের বিনা মূল্যের পাঠ্যবই ছাপার কাজ। কিন্তু এই বই ছাপাকে ঘিরেই উঠেছে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ। সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, অথচ অভিযোগ রয়েছে—অতিরিক্ত মুনাফার আশায় কোথাও কোথাও ছাপা হচ্ছে নিম্নমানের বই! ২০২৭ সালের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য প্রায় ৩০ কোটি ৬১ লাখ ৯৮ হাজার কপি পাঠ্যবই ছাপাতে ১৩৩টি মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। গতবারের তুলনায় এবার বই মুদ্রণের খরচ বেড়েছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এর পাশাপাশি ছাপাখানাগুলোর সিন্ডিকেট করে প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকা বেশি দর দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। সব মিলিয়ে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা।
তবে বাড়তি ব্যয়ের মধ্যেও বইয়ের মান নিয়ে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে গঠিত পরিদর্শন দল, এনসিটিবির টিম ও ইন্সপেকশন এজেন্ট ৫২টি ছাপাখানা পরিদর্শন করে। সেখানে প্রাথমিকের নিম্নমানের বইয়ের এক কোটির বেশি ফর্মা কেটে বিনষ্ট করা হয়েছে। পরিদর্শনে ধরা পড়ে ফর্মা মিসিং, ডাবল ফর্মা, নিম্নমানের কালি, বাঁধাইয়ের ত্রুটি, আলট্রা ভার্নিশ না করা এবং নিম্নমানের কাটিংয়ের মতো অনিয়ম। কোথাও বইয়ের প্রথম কয়েকটি পাতায় ভালো কাগজ ব্যবহার করা হলেও ভেতরের পাতায় ব্যবহার করা হয়েছে নিম্নমানের কাগজ।
মোল্লা প্রেস অ্যান্ড পাবলিকেশন ও অটো প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিংয়ে পঞ্চম শ্রেণির সমাজবিজ্ঞান বইয়ের মানচিত্রের রং পরিবর্তন এবং পাশের লেখা অস্পষ্ট পাওয়ায় সেসব বই কেটে ফেলা হয়েছে। একই সঙ্গে নিম্নমানের কালি জব্দ করে নষ্ট করা হয়। সংশ্লিষ্ট ছাপাখানার মালিককে ডেকে সতর্কও করা হয়েছে। এদিকে রেদওয়ানিয়া প্রেস, লেটার অ্যান্ড কালার এবং ফরাজি প্রেসেও নিম্নমানের বই শনাক্ত করে কেটে বিনষ্ট করা হয়েছে। এনসিটিবির কর্মকর্তাদের দাবি, অধিকাংশ ছাপাখানাই দরপত্রের শর্ত পুরোপুরি মানছে না।
অন্যদিকে, বইয়ের কাগজ অনুমোদন নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের কাগজ অনুমোদন না দেওয়ায় ইন্সপেকশন প্রতিষ্ঠানের এক কর্মকর্তাকে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এনসিটিবি বলছে, পাঠ্যবইয়ের মান নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি চলছে এবং অনিয়ম পাওয়া গেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মুদ্রণ শিল্প সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কারণে কেউ সক্ষমতার তুলনায় কম, আবার কেউ সক্ষমতার দ্বিগুণ কাজ পাচ্ছেন। সব মিলিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের হাতে শেষ পর্যন্ত কেমন মানের বই পৌঁছাবে?