কুমিল্লায় ১৩ বছরের শিশু ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সামনে এসেছে দেড় বছর আগের একটি ঘটনা। হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদকে ২০২৫ সালে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গাঁজাসহ আটক করেছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর এবং অপ্রতিমের মা ড. নাহিদা বেগম। এখন সেই পুরোনো ঘটনার সঙ্গে সন্তানের হত্যার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শোকাহত এই মা। ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের লালন চত্বর থেকে গাঁজাসহ সাত কিশোরকে আটক করেছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল টিম। সে সময় ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্বে ছিলেন ড. নাহিদা বেগম। অভিযানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর মাহমুদুল হাসান রাহাত ও মুতাসিম বিল্লাহও উপস্থিত ছিলেন।
আটক কিশোরদের বয়স ১৮ বছরের কম হওয়ায় তাদের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনা করে অভিভাবকদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল বলে তখন জানিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সহকারী প্রক্টর মুতাসিম বিল্লাহও জানিয়েছেন, আটক সাত কিশোরের মধ্যে ফাহাদ ছিল এবং পরিবারের সদস্যরা এসে মুচলেকা দিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নেন। তবে ফাহাদের মা জুলি আক্তার সে সময় ছেলের ওই ঘটনায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন। বর্তমানে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম আসামি মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের সালমানপুর এলাকার বাসিন্দা। সে ময়নামতি কারিগরি স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
তদন্তে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে এসেছে। চলতি মাসের ২ সেপ্টেম্বর অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের ইলেকট্রিক প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেয় ফাহাদ। অপ্রতিমের বাবা জানিয়েছেন, প্রায় দেড় বছর আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গাঁজাসহ আটক হওয়া কিশোরদের একজনই এই ফাহাদ। এর কয়েকদিন পরই ঘটে মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার কুমিল্লার কোটবাড়ির গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় কুমিল্লা বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ফাহাদসহ তিনজন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ কী, অপ্রতিমকে কেন টার্গেট করা হয়েছিল এবং তার বাবার প্রতিষ্ঠানে ফাহাদের চাকরি নেওয়ার সঙ্গে ঘটনার কোনো সম্পর্ক ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে। এদিকে মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান কুমিল্লা জেলা আইনজীবী সমিতির নেতারা। এ সময় সন্তান হারানোর শোকে ভেঙে পড়েন ড. নাহিদা বেগম।
তিনি অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন মাধ্যমে তার সন্তানকে জড়িয়ে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। তার দাবি, অপ্রতিমকে কোনো অপরাধী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা সত্য নয়। ড. নাহিদা আরও প্রশ্ন তোলেন, ২০২৫ সালে ভারপ্রাপ্ত প্রক্টরের দায়িত্ব পালনকালে ক্যাম্পাসে মাদকবিরোধী অভিযানে যারা আটক হয়েছিল, তাদের কারও প্রতিশোধের কারণে যদি তার সন্তানকে টার্গেট করা হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার কারণে যদি তার সন্তানকে হত্যা করা হয়ে থাকে, তবে এর পেছনে থাকা ব্যক্তিদের কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনা জরুরি। অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডে পুরোনো মাদক আটকের ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে ফাহাদের ওই পরিবারের প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেওয়ার তথ্য তদন্তে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তে নিশ্চিত হয়নি। তাই অপ্রতিম হত্যার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের বিষয়ে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের দিকেই এখন তাকিয়ে পরিবার ও স্থানীয়রা।