চারদিকে বন-জঙ্গল। টিনশেডের আধাপাকা ঘরগুলোর টিনের ছাউনি নেই, নেই দরজা-জানালাও। বিশাল আকৃতির দুটি ভবনের অবস্থাও একই। কাঠের দরজা-জানালা

১৯ বছরেও চালু হয়নি ৫ কোটির প্রকল্প, রামগড়ে আবাসিক অনাথ স্কুল যেন ‘ভূতুরেবাড়ি’

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৩২ সময় , আপডেট সময় : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৩২ সময়

চারদিকে বন-জঙ্গল। টিনশেডের আধাপাকা ঘরগুলোর টিনের ছাউনি নেই, নেই দরজা-জানালাও। বিশাল আকৃতির দুটি ভবনের অবস্থাও একই। কাঠের দরজা-জানালা ঘুণে খেয়ে ভেঙে গেছে। কক্ষের ভেতরে পড়ে আছে স্কুল বেঞ্চ, পড়ার টেবিল-চেয়ার, স্টিলের দোতলা খাটসহ নানা আসবাবপত্র। দীর্ঘদিন ব্যবহারের অভাবে এসব সামগ্রীর বেশিরভাগই এখন নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতিটি কক্ষে মাকড়সা ও নানা ধরনের পোকামাকড়ের বাসা। দেয়ালজুড়ে জঙ্গলি লতা, খসে পড়ছে পলেস্তারা। দিনের বেলাতেও ভেতরে বিরাজ করছে অন্ধকার পরিবেশ। সব মিলিয়ে যেন পরিত্যক্ত কোনো ভূতুড়ে বাড়ি। অথচ এটি খাগড়াছড়ির রামগড় পৌরসভার তৈছালাপাড়া এলাকায় এতিম ও অনাথ শিশুদের জন্য সরকারি অর্থে নির্মিত একটি আবাসিক স্কুল।


স্থানীয় এতিম ও অনাথ বালক-বালিকাদের বিনা মূল্যে লেখাপড়ার সুযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় ১৯ বছর আগে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণ করা হয়। সেখানে শ্রেণিকক্ষ, বেঞ্চ ও শিক্ষার প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পাশাপাশি বালক ও বালিকাদের জন্য আলাদা দুটি বড় আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিটি আবাসিক ভবনে রয়েছে পাঁচটি করে হলরুম, খাবারের কক্ষ, কার্যালয়, তত্ত্বাবধায়কের কক্ষ এবং উন্নতমানের শৌচাগার। শিক্ষার্থীদের জন্য কেনা হয়েছিল স্টিলের দোতলা খাট, লেপ, তোশক, বিছানার চাদর, বালিশ, মশারি, পড়ার টেবিল ও চেয়ার। খাবারের কক্ষ ও রান্নাঘরের জন্যও প্রয়োজনীয় আসবাব, তৈজসপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী কেনা হয়েছিল।


এ ছাড়া প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য পৃথক আবাসিক ব্যবস্থাও করা হয়। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থাও ছিল। প্রায় ১২ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত পুরো প্রতিষ্ঠানটি পাকা সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরা। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০০৫-০৬ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে তৎকালীন বোর্ড চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূইয়া রামগড়ের এতিম-অনাথ শিশুদের জন্য এই আবাসিক স্কুলের প্রকল্প গ্রহণ করেন। একই সময়ে রাঙামাটির রাজস্থলী ও বান্দরবানের রুমাতেও একই ধরনের প্রকল্প নেওয়া হয়।


তিনটি প্রতিষ্ঠানের জন্য পাঁচ কোটি টাকা করে মোট ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ঠিকাদারের মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করার পর রাজস্থলী ও রুমার প্রতিষ্ঠান চালু হলেও রামগড়ের স্কুলটি আর চালু করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে রামগড়ের স্কুলের জন্য চারজন নিরাপত্তাকর্মী, দুজন টেবিল বয়, দুজন আয়া, একজন পিয়ন ও একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরের বছর ৬০ জন এতিম ও অনাথ বালক এবং ৬০ জন বালিকা ভর্তির প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করা হয়। কিন্তু সরকারের পরিবর্তনের পর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত স্কুলটির কার্যক্রম শুরু হয়নি।


গত শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার কারণে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও মূল্যবান সম্পদের বড় অংশ ধ্বংসের মুখে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য কেনা লেপ, তোশক, বালিশ, বিছানার চাদর, মশারি, খাবারের কক্ষ ও রান্নাঘরের তৈজসপত্র, বৈদ্যুতিক পাখা, বাতি, পানির ট্যাংকসহ বিভিন্ন সামগ্রী কক্ষের ভেতরে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। অনেক সামগ্রী নষ্ট হয়ে গেছে, আবার কিছু জিনিস চুরি হয়ে যাওয়ার কথাও জানা গেছে।


অহিদুর রহমান নামে একজন তত্ত্বাবধায়ক সেখানে নিয়োজিত থাকলেও তিনি নিয়মিত বেতন পান না বলে জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের খাগড়াছড়ির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ১৯ বছর ধরে স্কুলটির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। তবে এটি চালুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দেশনা আসেনি।


এদিকে গত শুক্রবার খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সংসদীয় কমিটির সভাপতি ওয়াদুদ ভূইয়া এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত অনুপ কুমার চাকমা স্কুলটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। এ সময় বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান শেখ ছালেহ আহাম্মদসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। পরিদর্শন শেষে ওয়াদুদ ভূইয়া বলেন, পার্বত্য এলাকার পাহাড়ি ও বাঙালি এতিম-অনাথ শিশুদের বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই রামগড়ে প্রতিষ্ঠানটি স্থাপন করা হয়েছিল। অবকাঠামো নির্মাণ, শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষার্থী ভর্তির প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর স্কুলটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হয়েছে এবং বর্তমানে ভবন, আসবাবপত্র ও শিক্ষার্থীদের জন্য কেনা সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে।


তিনি আরও দাবি করেন, স্কুলটি পাহাড়ি ও বাঙালি সব সম্প্রদায়ের এতিম-অনাথ শিশুদের জন্য স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় আজ এটি প্রায় ধ্বংসের মুখে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল অবসরপ্রাপ্ত অনুপ কুমার চাকমা স্কুলটির বর্তমান অবস্থা দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এত সুন্দর একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও সেটি চালু করা হয়নি। সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ এভাবে ধ্বংস হওয়া দুঃখজনক। তিনি জানান, রামগড়ের পরিত্যক্ত আবাসিক এতিম-অনাথ স্কুলটি চালুর বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯