বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের প্রায়

গড়ে ওঠার অপেক্ষায় দেড় হাজার পর্যটন স্পট

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪১ সময় , আপডেট সময় : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪১ সময়

বাংলাদেশের পর্যটন খাতকে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে আরও শক্তিশালী করতে বড় ধরনের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। দেশের প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন আকর্ষণকে চিহ্নিত করে তৈরি হচ্ছে ‘সমন্বিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা’। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই এই মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র তৈরি নয়, বরং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পর্যটন সম্পদকে একটি সমন্বিত ভ্রমণ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।


সরকারের লক্ষ্য, বর্তমানে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে পর্যটন খাতের যে ২ থেকে ৩ শতাংশ অবদান রয়েছে, তা বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি পর্যটন খাতের প্রকৃত অর্থনৈতিক অবদান, কর্মসংস্থান এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করতে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর আওতায় ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট তৈরির কাজও শুরু হয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, দেশের প্রায় ১ হাজার ৪৯৮টি পর্যটন কেন্দ্র চিহ্নিত করে মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে চলছে। প্রতিটি পর্যটন আকর্ষণের ধরন, অবস্থান, সম্ভাবনা, অবকাঠামো, বিনিয়োগের সুযোগ এবং উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করেই পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে।


পরিকল্পনায় দেশের পর্যটন সম্পদকে আটটি অঞ্চলে ভাগ করে বিভিন্ন পর্যটন গুচ্ছ, পর্যটন পণ্য এবং বিনিয়োগ প্রকল্পের প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছে। ১৪টি পর্যটনভিত্তিক বিষয়ের আওতায় ২০০টিরও বেশি প্রকল্প এবং পাঁচটি বিশেষ গুরুত্বের প্রকল্প চিহ্নিত করার কথা রয়েছে। তবে এই মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্রে রাস্তা বা স্থাপনা নির্মাণ নয়। বরং একটি অঞ্চলের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সাংস্কৃতিক সম্পদকে একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত করে পর্যটকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ ভ্রমণপথ তৈরি করা। অর্থাৎ একজন পর্যটক যেন একটি অঞ্চলে গিয়ে একাধিক আকর্ষণ সহজেই ঘুরে দেখতে পারেন, সেই ব্যবস্থাই গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।


এই নেটওয়ার্কে সুন্দরবন, কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও হ্রদ, সিলেটের চা-বাগান, নদী ও জলাভূমি, প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সম্পদ যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন সচিব ফাহমিদা আখতার জানিয়েছেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই সমন্বিত জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা হালনাগাদের কাজ শেষ করা সম্ভব। এরপর এই পরিকল্পনার আলোকে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে।


তিনি জানিয়েছেন, জিডিপিতে পর্যটন খাতের বর্তমান ২ থেকে ৩ শতাংশ অবদান বাড়িয়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশে নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট চালু হলে পর্যটন খাতে কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা, বিদেশমুখী ও বিদেশি পর্যটন, পর্যটকদের পছন্দের গন্তব্যসহ খাতটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যাবে। দেশের পর্যটন মহাপরিকল্পনার কাজ অবশ্য নতুন নয়। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের উদ্যোগে ২০১৯ সালে এই কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। কিন্তু করোনাভাইরাস মহামারি, প্রশাসনিক জটিলতা এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে দীর্ঘ সময় ধরে এর বাস্তবায়ন থমকে ছিল। গত বছর মহাপরিকল্পনাটি পুনর্মূল্যায়নের জন্য পর্যটন বোর্ডে ফেরত পাঠানো হয়। নতুন করে সেই প্রক্রিয়ায় গতি এসেছে।


বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬ প্রণয়নের কাজও এগিয়ে চলছে। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্লগার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সাংবাদিকদের যুক্ত করে বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদ তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা ও বিভিন্ন আয়োজনেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ বাড়ানো হচ্ছে।


শুধু প্রচারণা নয়, পর্যটন খাতের কর্মীদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি বিমানবন্দরে বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে প্রথম যোগাযোগকারী ইমিগ্রেশন পুলিশের সদস্যদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদেশি পর্যটকদের সামনে বাংলাদেশের আতিথেয়তার ঐতিহ্যকে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরতে চায় সরকার। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান জানিয়েছেন, দেশের চিহ্নিত পর্যটন সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৬০টি উন্নয়ন প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পর্যটন অবকাঠামো আরও আধুনিক ও আন্তর্জাতিক মানের করার সুযোগ তৈরি হবে।


তবে এত বড় পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উঠে আসছে পরিবেশ সুরক্ষা। পর্যটনকেন্দ্র উন্নয়নের নামে অতিরিক্ত স্থাপনা, অপরিকল্পিত হোটেল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, যানজট এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত চাপের মতো সমস্যার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এবার পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পর্যটনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক পর্যটন ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে পর্যটনকেন্দ্র থেকে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক সুযোগ শুধু বাইরের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। স্থানীয় মানুষ আবাসন, খাবার, নৌযান, পরিবহন, পর্যটক গাইড, কারুশিল্প, কৃষিপণ্য এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আয় করার সুযোগ পাবেন।


বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকাগুলোকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করে ঢাকার বাইরে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাই এই পরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য। বাংলাদেশ পর্যটন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০৪১ সাল পর্যন্ত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ৫০ লাখ ৫০ হাজার বিদেশি পর্যটক আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২ কোটি ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ৭২ লাখ ৮৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য ধরা হয়েছে।


কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে কেন্দ্র করেও বড় ধরনের পর্যটন আকর্ষণ গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে পর্যটকের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ যেন না পড়ে, সেটিই সেখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু রাস্তা কিংবা বিলাসবহুল হোটেল তৈরি করলেই আন্তর্জাতিক পর্যটক আকৃষ্ট করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, আধুনিক পর্যটন তথ্য, সহজ ভিসা ব্যবস্থা এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রচারণা। সরকারি নীতি সহায়তা, অবকাঠামো এবং পর্যটনসেবার সব উপাদান একসঙ্গে কাজ করতে পারলেই বাংলাদেশের পর্যটন খাত বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯