কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসার অন্যতম প্রধান সরকারি আশ্রয়স্থল ৫০ শয্যার মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ১৩টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার বিপুল জনগোষ্ঠী এই হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল হলেও দীর্ঘদিন ধরে ভয়াবহ চিকিৎসকসংকটে কার্যত নাজুক হয়ে পড়েছে চিকিৎসাসেবা। যেখানে উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ ৪৪ জন চিকিৎসক থাকার কথা, সেখানে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৭ জন। অর্থাৎ ৩৭টি চিকিৎসক পদই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এত বড় জনগোষ্ঠীর চিকিৎসাসেবা মাত্র সাতজন চিকিৎসক দিয়ে চালাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা। দূর-দূরান্ত থেকে হাসপাতালে এসে টিকিট কাটার পর চিকিৎসকের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে অনেক রোগীকে। অভিযোগ রয়েছে, কাঙ্ক্ষিত এমবিবিএস চিকিৎসকের সেবা না পেয়ে অনেকেই নন-এমবিবিএস চিকিৎসকের মাধ্যমে সেবা নিতে বাধ্য হচ্ছেন।
স্থানীয় রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসংকট নতুন কোনো সমস্যা নয়। দীর্ঘদিন ধরে এই সংকট চললেও এর স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একদিকে চিকিৎসকের সংখ্যা কম, অন্যদিকে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগীর চাপ। এতে কর্মরত চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব ও কাজের চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে রোগীদের দীর্ঘ অপেক্ষা, ভিড় এবং কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা না পাওয়ার অভিযোগও বাড়ছে।
শুধু চিকিৎসকসংকটই নয়, হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। আউটডোরে রোগী দেখা চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকের নাম, পদবি ও সিল থাকা বাধ্যতামূলক করার দাবি দীর্ঘদিনের। রোগীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও সেটি বাস্তবায়ন করা হয়নি। রোগীদের মতে, ব্যবস্থাপত্রে চিকিৎসকের নাম, পদবি ও সিল থাকলে কোন চিকিৎসক রোগী দেখেছেন, তা সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে চিকিৎসাসেবায় স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি দায়িত্বশীলতা ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, সাড়ে ৪ লাখের বেশি মানুষের চিকিৎসার জন্য মাত্র সাতজন চিকিৎসক দিয়ে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। এত কম জনবল দিয়ে বহির্বিভাগ, জরুরি চিকিৎসা এবং অন্যান্য সেবা স্বাভাবিকভাবে চালিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ফলে একদিকে চিকিৎসকদের ওপর বাড়ছে চাপ, অন্যদিকে রোগীদেরও পোহাতে হচ্ছে দীর্ঘ অপেক্ষা ও নানা ধরনের ভোগান্তি। তাদের দাবি, দ্রুত মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ৩৭টি শূন্য চিকিৎসক পদে জনবল নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি আউটডোরে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকের পরিচয়সংবলিত সিল ব্যবহারের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটিও দ্রুত কার্যকর করতে হবে।
হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলোর দিকেও নজর দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে নষ্ট জেনারেটর প্রতিস্থাপনসহ হাসপাতালের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দীর্ঘদিনের চিকিৎসকসংকট এবং অন্যান্য অব্যবস্থাপনা দ্রুত দূর করা না হলে মিরপুর উপজেলার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা আরও ব্যাহত হতে পারে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষ, যাদের বড় একটি অংশ চিকিৎসার জন্য সরকারি এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভরশীল।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দেওয়া আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়নের প্রত্যাশা স্থানীয়দের। তাদের দাবি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক নিয়োগ, সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং হাসপাতালের অবকাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করা হলে মিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স আবারও বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য স্বাভাবিক ও মানসম্মত সরকারি চিকিৎসাসেবার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।