জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ইরান ও কিউবা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির কঠোর সমালোচনা করেছে চীন। একই সঙ্গে পারস্য উপসাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। কিউবার ওপর চাপ ও অবরোধ বন্ধের দাবিও তুলেছে বেইজিং। ফলে জাতিসংঘের মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়ার বক্তব্য নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
শনিবার ২৬ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে দেওয়া ভাষণে চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেং বেইজিংয়ের এই অবস্থান তুলে ধরেন। যদিও ভাষণে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাম সরাসরি উল্লেখ করেননি। হান ঝেং বলেন, পারস্য উপসাগরসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি সম্মান দেখানো উচিত। আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় বড় শক্তিগুলোর বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মেনে চলা, আইনের শাসন বজায় রাখা এবং সঠিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে পরাশক্তিগুলোকেই নেতৃত্ব দিতে হবে।
কিউবার প্রসঙ্গেও কঠোর অবস্থান তুলে ধরেন চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট। তিনি সংশ্লিষ্ট দেশকে কিউবার বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের হুমকি বন্ধ করার পাশাপাশি দেশটির ওপর আরোপিত অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়ার আহ্বান জানান। চীনের এই অবস্থান এমন সময়ে সামনে এলো, যখন চলতি সপ্তাহের শুরুতে হোয়াইট হাউসে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। সেখানে সামরিক বিমানের ফ্লাইওভার ও রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের মাধ্যমে চীনা প্রেসিডেন্টকে অভ্যর্থনা জানানো হয়েছিল। জাতিসংঘে হান ঝেংয়ের বক্তব্যকে সেই বৈঠকের তুলনায় ভিন্ন সুর হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর আগে শুক্রবার চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটনে বৈঠকের সময় ট্রাম্প ইরানকে যেকোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া থেকে বিরত থাকতে সি চিন পিংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। জবাবে চীন এমন সহায়তা করবে না বলে আশ্বাস দিয়েছে বলেও তিনি জানান। ইরানকে কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল বিক্রির ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের সহায়তার অভিযোগ সামনে আসার পর ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এই আহ্বান জানানো হয় বলে মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।
এদিকে কিউবার পরিস্থিতি নিয়েও জাতিসংঘে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। চীনের দাবি, অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার কারণে কিউবার অর্থনীতি ও জ্বালানি পরিস্থিতির ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি সংকট ও পুরোনো অবকাঠামোর কারণে সমস্যার মধ্যে রয়েছে। চীনের ভাইস প্রেসিডেন্ট তাঁর ভাষণে চীনকে বৈশ্বিক মঞ্চে একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর দৃঢ় সমর্থক হিসেবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ছোট কিংবা বড়—সব দেশই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমান সদস্য। বিশ্বের বিভিন্ন সংকট ও বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
চীনের বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা পর একই অধিবেশনে বক্তব্য দেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ। কিউবার ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার এবং দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যে আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। লাভরভ আরও বলেন, কিউবাকে সন্ত্রাসবাদের মদদদাতা দেশের তালিকা থেকেও যুক্তরাষ্ট্রের বাদ দেওয়া উচিত।
কিউবার বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের জ্বালানি ঘাটতি ও পুরোনো বিদ্যুৎ উৎপাদনব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপের কারণে পরিস্থিতি নাজুক হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের তেল অবরোধের পর বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে বলে কিউবার পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে ইরান ও কিউবা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির বিরুদ্ধে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। পাশাপাশি বড় শক্তিগুলোর দায়িত্ব, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।