মিরপুরে রাতের আঁধারে একটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এবার পুলিশের ভূমিকা নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তাঁর অভিযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাটের সময় ঘটনাস্থলে পুলিশ উপস্থিত থাকলেও হামলা ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। সিসিটিভি ফুটেজেও ভাঙচুর ও লুটপাটের সময় পুলিশের গাড়ি ঘটনাস্থলের বাইরে থাকার দৃশ্য দেখা গেছে বলে একাধিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। রোববার ২৭ সেপ্টেম্বর মিরপুর-১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার পরিদর্শনে গিয়ে এসব অভিযোগ করেন আসিফ মাহমুদ।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে মিরপুরের সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছিল রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার। শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রসূতি সেবা, পরিবার পরিকল্পনা এবং টিকাদানসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়া হতো এই কেন্দ্রে। ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মুখোশধারী দুই শতাধিক ব্যক্তি সেখানে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। পরে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির চারটি ভবন গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরিদর্শনের সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির প্রবেশপথে টাঙানো ‘সমমনা দোকানদার সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড সরিয়ে দেন এনসিপির নেতা-কর্মীরা। একই সঙ্গে দোকানদার সমিতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরও কিছু নিদর্শনও সরিয়ে ফেলা হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
পরিদর্শন শেষে আসিফ মাহমুদ অভিযোগ করেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ওষুধ, ইনজেকশন, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং দরিদ্র শিশুদের জন্য রাখা টিকাও লুট করা হয়েছে। তিনি বলেন, একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ঘটনা ঘটার সময় পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, একটি এক্সকাভেটর যখন কোনো স্থাপনা ভাঙতে আসে, তখন সেটি সেখানে কাজ করার অনুমতি পেয়েছে কি না, তা যাচাই করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাঁর অভিযোগ, ভাঙচুর শুরু হওয়ার পরও পুলিশ তা বন্ধ করার কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি।
সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, লুটপাটের সময় স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে বিভিন্ন মালামাল পিকআপে তোলা হচ্ছিল এবং বাইরে পুলিশের একটি গাড়ি অবস্থান করছিল। এর আগে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও ঘটনার সময় পুলিশ উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেছিলেন। আসিফ মাহমুদ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের ‘মবতন্ত্রের কবর রচনা’ সংক্রান্ত বক্তব্যের প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর দাবি, একদিকে মবতন্ত্র বন্ধের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে অল্প সময়ের ব্যবধানে মিরপুরের স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে।
তবে পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধ করা পুলিশের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। কোনো পুলিশ সদস্যের দায়িত্বে অবহেলা বা গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। এরই মধ্যে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, লুটপাট ও ধ্বংসের ঘটনায় গ্রেপ্তারের সংখ্যা বেড়ে নয়জনে দাঁড়িয়েছে এবং লুট করা মালামালের দুই ট্রাক উদ্ধার করা হয়েছে বলে ঢাকা মহানগর পুলিশ জানিয়েছে। একই ঘটনায় শাহ আলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলমকে প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করা হয়েছে।
অন্যদিকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির নির্বাহী পরিচালক ডা. নাসরিন আখতার ২৬ সেপ্টেম্বর শাহ আলী থানায় মামলা করেছেন। মামলায় ২০০ থেকে ২৫০ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির বিরুদ্ধে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা ধ্বংসের অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় এখন একদিকে হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রশ্ন, অন্যদিকে ঘটনার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে ওঠা অভিযোগ—দুই বিষয়ই সামনে এসেছে। তদন্তে হামলার পেছনে কারা ছিল এবং পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকার পরও কেন ভাঙচুর ঠেকাতে পারেনি, এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।