রোহিঙ্গা সংকটের প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও সমাধানের পথ এখনো অধরা। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা যেমন কমছে, তেমনি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ নিয়েও উঠছে প্রশ্ন। এই পরিস্থিতিতে সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও জোরালো পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত আইরিন খান।
নিউইয়র্ক থেকে বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আইরিন খান বলেন, রোহিঙ্গাদের সহায়তা করা, কঠিন সময়ে বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়া এবং এই জনগোষ্ঠীর জন্য একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে বের করা—এই তিন ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারে ঘাটতি রয়েছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জনাকীর্ণ শিবিরগুলোতে বছরের পর বছর ধরে তাদের বসবাস করতে হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যেই মানবিক সহায়তার পরিমাণ কমে আসছে।
আইরিন খান জানান, রোহিঙ্গারা প্রায় নয় বছর ধরে শিবিরে বসবাস করছে। এই সময়ে সেখানে একটি নতুন প্রজন্ম বেড়ে উঠছে। প্রতিবছর প্রায় ৩০ হাজার শিশু শিবিরগুলোতে জন্ম নিচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার প্রশ্ন, একটি শিবিরে নয় বছর থাকার পর এসব মানুষের ভবিষ্যৎ কী হবে? এ কারণেই রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় হিসেবে না দেখে এর রাজনৈতিক সমাধানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে গত ২৩ সেপ্টেম্বর রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে উচ্চপর্যায়ের এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের ওপর জোর দেন। তিনি বলেন, এখন শুধু বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা নয়, বরং এই বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রধানমন্ত্রী সেখানে রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ তৈরির প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি মিয়ানমারে বেসামরিক মানুষের ওপর সহিংসতা বন্ধ, রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমানযোগ্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
তার প্রস্তাবের মধ্যে আরও রয়েছে বিচার ও জবাবদিহি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং মাদকপাচার, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্রসহ আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো। আইরিন খানও বলেছেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও সেখানে খুঁজে বের করতে হবে। তার মতে, রোহিঙ্গারা নিজ দেশে ফিরে যেতে আগ্রহী, তবে তারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরতে চায়।
এ জন্য বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এমন একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া চায়, যেখানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনা হবে। বাংলাদেশ, মিয়ানমার, সংকটে প্রভাবিত আঞ্চলিক দেশ এবং মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তার বা প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে—এমন দেশগুলোকেও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার কথা বলেছেন তিনি।
আইরিন খান আরও বলেন, মিয়ানমার সরকারকে তাদের আইনগত দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, যাতে তারা নিজেদের জনগণকে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করে। একইসঙ্গে মিয়ানমারের ভেতরে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে রোহিঙ্গারা নিরাপদে ফিরে যেতে পারেন। জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর আরও বেশি দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন দেশগুলোর আরও কার্যকরভাবে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করে জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত জুলি বিশপও বলেছেন, ২০১৭ সালের ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির প্রায় এক দশক পরও বাংলাদেশে ১২ লাখের বেশি মানুষ আশ্রয় নিয়ে আছে এবং নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। ফলে রোহিঙ্গা সংকট এখন বাংলাদেশের জন্য শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রত্যাবাসন, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কীভাবে এই আহ্বানে সাড়া দেয় এবং মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখে—এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।