একটি মিসড কল—আর সেই কলের সূত্র ধরেই ১২ বছর ধরে নিখোঁজ থাকা এক তরুণের সন্ধান! কিন্তু তাকে খুঁজে

এক যুগ পর পাঁচ আসামির দায়মুক্তি, মিথ্যা অপহরণ মামলায় জেল-রিমান্ড

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪৪ সময় , আপডেট সময় : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ৯:৪৪ সময়

একটি মিসড কল—আর সেই কলের সূত্র ধরেই ১২ বছর ধরে নিখোঁজ থাকা এক তরুণের সন্ধান! কিন্তু তাকে খুঁজে পাওয়ার পর সামনে আসে আরও চমকে দেওয়ার মতো সত্য। যাকে অপহরণ করা হয়েছে বলে মামলা হয়েছিল, সেই তরুণই নিজের ইচ্ছায় নিখোঁজ হওয়ার নাটক সাজিয়েছিলেন। আর তার এই সিদ্ধান্তের কারণে অপহরণ মামলায় আসামি হওয়া পাঁচ তরুণকে এক যুগ ধরে জেল, রিমান্ড ও নানা হয়রানির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। ঘটনাটি রাজধানীর পল্লবীর। ২০১০ সালের ৩১ আগস্ট সকালে প্রতিদিনের মতো কর্মস্থলে যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হন সুমন। তখন তার বয়স ছিল ১৭ বছর। কিন্তু সেদিন আর বাসায় ফেরেননি তিনি। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও ছেলের সন্ধান না পেয়ে তার বাবা মোজাফফর ওই বছরের ৫ অক্টোবর পল্লবী থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।


পরে বিভিন্ন সূত্রে তিনি জানতে পারেন, পল্লবীর একটি গার্মেন্টসের সামনে থেকে তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। এরপর ২০১০ সালের ২৯ অক্টোবর পল্লবী থানায় অপহরণ মামলা করেন তিনি। মামলায় সুলায়মান হোসেন, শাওন পারভেজ, রুবেল, সোহাগ ও মানিক—এই পাঁচ তরুণকে আসামি করা হয়।এরপর শুরু হয় দীর্ঘ তদন্ত। প্রথমে পল্লবী থানা মামলাটি তদন্ত করে। কিন্তু সুমনের কোনো সন্ধান না পাওয়ায় তদন্তভার যায় মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। পরে ২০১২ সালের মার্চে পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় অপরাধ তদন্ত বিভাগকে।


তাতেও রহস্যের সমাধান হয়নি। বাদীর নারাজি আবেদনের পর তদন্তভার আবার গোয়েন্দা পুলিশের কাছে যায়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে তারাও কোনো রহস্য উদ্ঘাটন করতে না পেরে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। পরে আদালতের নির্দেশে মামলাটির অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে তদন্ত শুরু করেন পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক মোহাম্মদ তরিকুল ইসলাম। বছরের পর বছর ধরে ক্লুলেস থাকা মামলাটির রহস্য উদ্ঘাটনে তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন সোর্স ব্যবহার করে তদন্ত চালাতে থাকেন তিনি।


অবশেষে ২০২২ সালের আগস্টে আসে সেই গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। সুমনের বাবার মোবাইলে একটি মিসড কল আসে। তিনি কলটি ফেরত দিলে এক নারী তার ছেলে সুমনের বিষয়ে জানতে চান। বিষয়টি সন্দেহজনক মনে হওয়ায় তিনি কোনো তথ্য না দিয়ে ফোনটি রেখে দেন এবং সঙ্গে সঙ্গে তদন্ত কর্মকর্তাকে বিষয়টি জানান। এরপর প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা সুমনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হন। রাজধানীর কদমতলী এলাকায় একটি বাসায় গিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা দেখতে পান—সেখানে সুমন তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস করছেন।


অবশেষে ২০২২ সালের ২৩ মে ওই বাসা থেকে সুমনকে উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালতে পাঠানো হয়। আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে সুমন জানান, ২০১০ সালের সেই দিন কর্মস্থলে যাওয়ার পথে তিনি জুয়ার আসরে যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে এক হাজার টাকা জুয়া খেলে হেরে যান তিনি। তার কাছে কোনো টাকা না থাকায় জুয়ার সঙ্গীদের কাছে নিজের মোবাইল ফোন রেখে দেন। ফোনটি তার বাবা কিছুদিন আগেই কিনে দিয়েছিলেন। এরপর ভয় থেকে আর বাসায় ফেরেননি সুমন।


পল্লবী থেকে চলে যান গুলিস্তানে। সেখানে একটি ভাতের হোটেলে কাজ শুরু করেন। পরে কদমতলীতে বাসা ভাড়া নিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানেই বিয়ে করেন এবং পরবর্তী সময়ে দুই সন্তানের বাবা হন। অর্থাৎ, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে যে ঘটনাকে অপহরণ হিসেবে তদন্ত করা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত জানা গেল সেটি ছিল সুমনের নিজের তৈরি নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। আর এই ঘটনায় নির্দোষ হয়েও পাঁচ তরুণকে এক যুগ ধরে মামলার বোঝা বহন করতে হয়েছে। তাদের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে এবং নানা ধরনের হয়রানি ও আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাদের পরিবারকেও।


পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মামলাটি ছিল সম্পূর্ণ ক্লুলেস। তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে শেষ পর্যন্ত সুমনের অবস্থান শনাক্ত ও তাকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। তবে সুমনকে খুঁজে পাওয়ার পর একটি বড় প্রশ্নও সামনে এসেছে—একজনের সাজানো নিখোঁজের ঘটনায় নির্দোষ পাঁচ তরুণকে যে এক যুগ হয়রানি ও দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, সেই ক্ষতির দায়ভার নেবে কে? এই প্রশ্নের উত্তরই এখন সংশ্লিষ্টদের সামনে সবচেয়ে বড় বিষয়।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯