বিশ্ব বাণিজ্যের চেহারা কি আবার বদলে যাচ্ছে? প্রতিযোগিতার বাজারে পণ্যের মান ও দামের বদলে যদি শুল্ক আর রাজনৈতিক

শুল্কের চাপে দুর্বল দেশকে পণ্য কিনতে বাধ্য করছে যুক্তরাষ্ট্র: রেহমান সোবহান

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৪ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১১:৪ সময় , আপডেট সময় : ৪ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১১:৪ সময়

বিশ্ব বাণিজ্যের চেহারা কি আবার বদলে যাচ্ছে? প্রতিযোগিতার বাজারে পণ্যের মান ও দামের বদলে যদি শুল্ক আর রাজনৈতিক চাপই বাজার দখলের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? এমনই বড় প্রশ্ন তুলে বিশ্ব বাণিজ্য আবার ঔপনিবেশিক যুগের দিকে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান।


শনিবার রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর ‘নতুন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক বিশৃঙ্খলা’ শীর্ষক অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। রেহমান সোবহানের মতে, বিশ্ব বাণিজ্যে আবারও ঔপনিবেশিক মডেলের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একসময় সরাসরি দেশ দখল করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এখন সেই পদ্ধতির পরিবর্তে শুল্ক, বাণিজ্যনীতি এবং রাজনৈতিক চাপ ব্যবহার করে দুর্বল দেশগুলোর বাজারে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলছে।


তিনি বলেন, কোনো দেশকে শুল্কের চাপ দিয়ে নির্দিষ্ট দেশের পণ্য কিনতে বাধ্য করার অর্থ হলো, সেখানে স্বাভাবিক প্রতিযোগিতার পরিবেশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বাজারে প্রতিযোগিতা করে পণ্য বিক্রির পরিবর্তে রাজনৈতিক চাপের মাধ্যমে বাজার তৈরি করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকারও সমালোচনা করেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখার কারণে ব্রাজিল, কানাডা, চীন এমনকি ভারতও বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে পড়ছে। অর্থাৎ বাণিজ্য এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় থাকছে না, এর সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িয়ে যাচ্ছে।


রেহমান সোবহান মনে করেন, এশিয়ার দ্রুত অর্থনৈতিক উত্থানের বিপরীতে পশ্চিমা বিশ্বের এক ধরনের বিকৃত প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। চীন, ভারত ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। এর ফলে এশিয়া এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।


আর এ পরিবর্তনের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও আগের মতো শুধু পশ্চিমা বিশ্বের বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ কিংবা মূলধনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে না। উনিশ শতকের শেষ দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলির সুরক্ষাবাদী নীতির প্রসঙ্গ টেনে রেহমান সোবহান বলেন, বাজার সুরক্ষার মাধ্যমে শিল্প পুনরুজ্জীবনের সেই কৌশল বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির জন্য আর কার্যকর নয়। একই সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতাও দিন দিন দুর্বল হচ্ছে।


তবে তার মতে, এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান থামানো সহজ হবে না। ক্রয়ক্ষমতার সমতার হিসাবে চীন ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ভবিষ্যতে চলতি মূল্যের মোট দেশজ উৎপাদনের হিসাবেও চীন যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আর এই পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্যও বড় সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে বলে মনে করেন রেহমান সোবহান। কারণ বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে চীন ও ভারতের মতো দুটি বড় অর্থনীতির কাছাকাছি অবস্থান করছে।


কিন্তু বড় প্রশ্ন হলো, সেই সুবিধা বাংলাদেশ কতটা কাজে লাগাতে পারছে? রেহমান সোবহানের মতে, বাংলাদেশের আমদানির বড় অংশ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে এলেও রপ্তানি এখনো কয়েকটি নির্দিষ্ট বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। দেশের উৎপাদন খাত এশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে কিছুটা যুক্ত হলেও, এসব অঞ্চলে তৈরি হওয়া নতুন বাজার ও রপ্তানি সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।


তাই বাংলাদেশের আঞ্চলিক সরবরাহ-শৃঙ্খলের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া প্রয়োজন বলে পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ নিয়ে অনেক পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যতের সুযোগ কাজে লাগাতে শুধু পরিকল্পনা নয়, তা বাস্তবায়নের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব শুধু বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক নয়, দেশের স্থলভৌগোলিক অবস্থানও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন এই অর্থনীতিবিদ। পদ্মা ও যমুনা সেতুকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া হয়ে ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ রয়েছে।


একসময় বাংলাদেশ, চীন, ভারত ও মিয়ানমারকে নিয়ে আঞ্চলিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিসিআইএম উদ্যোগের কথাও স্মরণ করেন তিনি। তবে এশিয়ার ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে ভারত ও চীনের মধ্যকার টানাপোড়েনের কথা তুলে ধরেন রেহমান সোবহান। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো সম্ভব হলে পুরো এশিয়ার অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হবে। আর বাংলাদেশও তাদের বিশাল বাজার, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগাতে পারে।


মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে এই সংঘাতের জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে সমালোচনা করেন। সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের আয়োজনে বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬-এর পঞ্চম আসরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনের এই আন্তর্জাতিক আয়োজনে শতাধিক দেশ থেকে প্রায় ২০০ বক্তা, ৩০০ প্রতিনিধি এবং এক হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯