ব্যাংক খাতে পরিবারকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত সংস্কারে এবার বড় বিতর্ক। এনসিপির নেতা ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, শেখ হাসিনার আমলে ব্যাংকের ওপর প্রভাবশালী পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, বিএনপি সরকার সেই ব্যবস্থাই আবার ফিরিয়ে আনছে। তবে এটি হাসনাত আবদুল্লাহর রাজনৈতিক অভিযোগ; একই সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, অর্থ মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কঠোর প্রস্তাব পরিবর্তন করে পরিবার থেকে তিনজন পরিচালক ও পরিচালকের টানা মেয়াদ নয় বছর রাখার সিদ্ধান্তের দিকে এগিয়েছে।
রোববার ৪ অক্টোবর নিজের ফেসবুক পোস্টে এই অভিযোগ করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি দাবি করেন, ব্যাংকগুলোকে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ থেকে দূরে রাখতে একসময় একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুইজন পরিচালক এবং একজন পরিচালকের টানা সর্বোচ্চ ছয় বছর দায়িত্ব পালনের বিধান ছিল। তার দাবি, পরবর্তী সময়ে এই নিয়ম পরিবর্তন করা হয়। ২০১৮ সালে পরিচালকের মেয়াদ নয় বছর এবং একই পরিবারের চারজনকে পর্ষদে থাকার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালে পরিবারের সদস্যের সংখ্যা তিনজনে নামিয়ে আনা হলেও পরিচালকের মেয়াদ ১২ বছর করা হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি। এসব পরিবর্তনের সমালোচনা করেছিলেন অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর—এমন দাবিও করেন হাসনাত।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর আহসান মনসুরের নেতৃত্বে ব্যাংক খাতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেখানে একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ দুইজন পরিচালক, একজন পরিচালকের টানা সর্বোচ্চ ছয় বছরের মেয়াদ এবং ব্যাংক পর্ষদের অন্তত ৫০ শতাংশ স্বাধীন পরিচালক রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। এদিকে সাম্প্রতিক বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাবিত ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনীতে একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা তিনজন থেকে কমিয়ে দুইজন এবং টানা মেয়াদ ১২ বছর থেকে ছয় বছরে নামানোর প্রস্তাব ছিল। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই দুটি প্রস্তাবই গ্রহণ করেনি। বরং একই পরিবার থেকে সর্বোচ্চ তিনজন পরিচালক রাখার বিধান বহাল রেখে টানা মেয়াদ ১২ বছর থেকে নয় বছরে নামানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
এ ছাড়া খেলাপি ঋণের সঙ্গে পরিচালকদের সংশ্লিষ্টতা এবং ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের ক্ষমতা নিয়েও সংশোধনীতে পরিবর্তনের বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যম। এই সিদ্ধান্তেরই তীব্র সমালোচনা করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া ব্যাংক সংস্কারের উদ্যোগ থেকে সরে গিয়ে নতুন করে প্রভাবশালী পরিবারগুলোর ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
হাসনাতের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্যাংক চলে সাধারণ মানুষের আমানতের অর্থে। তাই কোনো নির্দিষ্ট পরিবারের দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ থাকা উচিত নয়। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, সংস্কার বাতিল হলে আওয়ামী ঘরানার প্রভাবশালী পরিবারের জায়গায় বিএনপি ঘরানার কিংবা নতুন করে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী পরিবারগুলো ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ পেতে পারে। তবে ব্যাংক কোম্পানি আইনের সংশোধনী এখনো নীতিগত পরিবর্তন ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রস্তাব এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্যই বর্তমানে বিতর্কের মূল বিষয়। ফলে চূড়ান্ত আইনে পরিবার থেকে কতজন পরিচালক থাকতে পারবেন এবং পরিচালকের সর্বোচ্চ মেয়াদ কত বছর হবে—সেটিই এখন ব্যাংক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।