ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটের দাম কোটি টাকা—এটা হয়তো অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয় না। কিন্তু মৃত্যুর পর মাত্র ৮

বনানীতে ৩২ বর্গফুট কবরের সংরক্ষণ ফি দেড় কোটি টাকা, ২৫ বছর পর করতে হয় নবায়ন

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৮ সময় , আপডেট সময় : ৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৮ সময়

ঢাকায় একটি ফ্ল্যাটের দাম কোটি টাকা—এটা হয়তো অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক মনে হয় না। কিন্তু মৃত্যুর পর মাত্র ৮ ফুট লম্বা আর ৪ ফুট চওড়া এক টুকরো মাটির জায়গা ২৫ বছরের জন্য ধরে রাখতেও যদি লাগে প্রায় দেড় কোটি টাকা, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—ঢাকায় শেষ ঠিকানাটাও কি এখন সামর্থ্যের বিষয় হয়ে গেছে? রাজধানীতে দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে কবরস্থানের জায়গার সংকট। প্রিয়জনের কবর ১৫ থেকে ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে গুনতে হচ্ছে ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত। সামর্থ্যবানরা অর্থ খরচ করে কবর সংরক্ষণ করতে পারলেও নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ভরসা সাধারণ কবর। নির্দিষ্ট সময় পর এসব কবর আবার ব্যবহার করা হয়।


অভিজাত এলাকা বনানীতে এই সংকট সবচেয়ে প্রকট। বনানী কবরস্থানে ৮ ফুট দৈর্ঘ্য ও ৪ ফুট প্রস্থের একটি কবর ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করতে খরচ হচ্ছে প্রায় দেড় কোটি টাকা। আর ১৫ বছরের জন্য দিতে হচ্ছে প্রায় ১ কোটি টাকা। অর্থাৎ জীবিত অবস্থায় বসবাসের জন্য যে অর্থে একটি বড় ফ্ল্যাট কেনা সম্ভব, প্রায় সেই অর্থেই মৃত্যুর পর পাওয়া যাচ্ছে সীমিত মেয়াদের একটি কবরের জায়গা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা গৌতম কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, বনানীতে উচ্চবিত্তদের বসবাসের কারণে কবর সংরক্ষণের আবেদন বেশি আসে। আগে ৯৯ বছর পর্যন্ত কবর সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও বর্তমানে তা কমিয়ে ১৫ থেকে ২৫ বছর করা হয়েছে। মেয়াদ শেষ হলে নবায়নের সুযোগ রয়েছে। তবে জায়গার সংকটের কারণে কবর সংরক্ষণ নিরুৎসাহিত করতে সাধারণ এলাকার তুলনায় সংরক্ষণ ফি তিন গুণ করা হয়েছে।


১৯৭৩ সালে চালু হওয়া বনানী কবরস্থানে বর্তমানে ৯ হাজারের বেশি কবর রয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কবরের জায়গা সংরক্ষণ বন্ধ ছিল। পরে ২০০৮ সাল থেকে বিভিন্ন মেয়াদে আবার কবর সংরক্ষণ শুরু হয়। কিন্তু বর্তমানে নতুন করে স্থায়ী কবরের জায়গা বরাদ্দ দেওয়ার সুযোগ প্রায় নেই। জায়গার সংকট সামাল দিতে পুরোনো কবরই নির্দিষ্ট সময় পর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। কবরস্থান সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন কবরের জায়গার জন্য প্রতিদিন মানুষ খোঁজ করলেও অনেকেই জায়গা পাচ্ছেন না।


বনানী কবরস্থানের মহরার দায়িত্বে থাকা হারুনুর রশীদ জানান, নতুন জায়গা না থাকায় পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রায় দুই বছর পর একটি কবরের ওপর আবারও দাফন করা হয়। এমনকি কোনো কোনো স্থায়ী কবরে সাতজন পর্যন্ত দাফনের রেকর্ড রয়েছে। জায়গার সংকটের কারণে জীবিত অবস্থায় কবর কিনে রাখার ব্যবস্থাও এখন প্রায় বন্ধ। শুধু বনানী নয়, একই চিত্র রাজধানীর অন্যতম পুরোনো আজিমপুর কবরস্থানেও। প্রায় ৩২ একর জায়গার এই কবরস্থানে রয়েছে প্রায় ৩০ হাজার কবর। প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি মরদেহ এখানে দাফন করা হয়। জায়গা সীমিত হওয়ায় সাধারণ কবর দীর্ঘদিন রাখা সম্ভব হয় না। সাধারণত একটি মরদেহের কবর প্রায় দেড় বছর ব্যবহারের পর প্রয়োজন অনুযায়ী সেখানে নতুন করে দাফন করা হয়।


নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার কবরস্থান সংকট মূলত দ্রুত নগরায়ণের একটি বড় প্রভাব। রাজধানীতে মানুষের বসবাস, কর্মসংস্থান, সড়ক, শিক্ষা, চিকিৎসা ও বাণিজ্যিক স্থাপনার জন্য জমির পরিকল্পনা থাকলেও মৃত্যুর পর মানুষের শেষ ঠিকানার জন্য প্রয়োজনীয় জমির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে নগর পরিকল্পনার প্রান্তে পড়ে আছে।


নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার জনসংখ্যা ও মৃত্যুর হার বিবেচনায় নিয়ে এখনই দীর্ঘমেয়াদি কবরস্থান ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা করা জরুরি। কারণ ভবিষ্যতে শুধু জীবিত মানুষের আবাসনের জন্য জমি নয়, মৃতদের জন্য এক টুকরো মাটি নিশ্চিত করাও নগরের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। নাগরিকদের অভিযোগ, অনেক কবরেই বছর না ঘুরতেই নতুন করে দাফন করা হয়। ফলে মুছে যায় প্রিয়জনের কবরের চিহ্ন, হারিয়ে যায় স্মৃতিও। আর শুধু অর্থ থাকলেই যে কবর সংরক্ষণ করা যায়, সেটিও নয়—অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও জায়গা পাওয়ার।


ডিএনসিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীর কবরস্থানগুলোতে অগ্রিম কবর সংরক্ষণ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এবং জায়গা পাওয়া সাপেক্ষে মৃত ব্যক্তির কবর নির্ধারিত ফি দিয়ে ১৫ কিংবা ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষণ করা যায়। রায়েরবাজার ও মিরপুরে তুলনামূলকভাবে জায়গা বেশি থাকায় সেখানে কবর সংরক্ষণের ফি কম। অন্যদিকে উত্তরা ও বনানীতে জায়গা কমে যাওয়ায় সংরক্ষণে নিরুৎসাহিত করতে ফি বাড়ানো হয়েছে।


সব মিলিয়ে, দ্রুত বাড়তে থাকা ঢাকায় জীবিত মানুষের জন্য আবাসন সংকটের পাশাপাশি সামনে আসছে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা—মৃত্যুর পর প্রিয়জনের জন্য এক টুকরো মাটি ধরে রাখাও দিন দিন হয়ে উঠছে ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯