জ্বরের পর থেকেই বদলে গেছে ১৪ বছরের আকলিমার আচরণ। এখন বাবাকে দেখলেই বারবার বলে, ‘তুই আমাকে মারার জন্য

চিকিৎসার বাইরে ৯২ শতাংশ মানসিক রোগী

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ১০ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:৭ সময় , আপডেট সময় : ১০ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:৭ সময়

জ্বরের পর থেকেই বদলে গেছে ১৪ বছরের আকলিমার আচরণ। এখন বাবাকে দেখলেই বারবার বলে, ‘তুই আমাকে মারার জন্য এনেছিস, আমাকে তুই বিয়ে দিবি।’ মেয়ের এমন অস্বাভাবিক আচরণে দিশেহারা বাবা জাকির হোসেন। কুমিল্লার দেবীদ্বার থেকে মেয়েকে নিয়ে এসেছেন ঢাকার মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েও মেলেনি স্বস্তি। দিনের পর দিন হাসপাতালে থেকেও মেয়ের অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় উদ্বেগে কাটছে পুরো পরিবারের সময়। আকলিমার এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের অসহায়ত্বের গল্প নয়, বরং দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সংকটেরও একটি চিত্র।


শুধু আকলিমা নয়, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সংকটে রয়েছে দেশের বহু পরিবার। রাজধানীর শ্যামলী জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অভিজ্ঞতায় উঠে এসেছে নানা সমস্যা। কেউ দীর্ঘদিনের মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন, কেউ আবার সন্তানকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে ছুটছেন এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে। পাবনা থেকে মেয়েকে নিয়ে এই হাসপাতালে এসেছেন এক মা। তাঁর মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েটির মোবাইল ফোন ব্যবহারের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তৈরি হয়েছিল। স্কুলে যেতে চাইত না, বাড়িতে থেকে শুধু ফোন ব্যবহার করতে চাইত। চিকিৎসার পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মা। চিকিৎসকেরা পরবর্তী সময়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দেওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। তবে অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের চিকিৎসার সুযোগ সীমিত থাকায় তাঁকে ঢাকায় আসতে হয়েছে বলে জানান ওই মা।


এমন বাস্তবতার মধ্যেই আজ, ১০ অক্টোবর পালিত হচ্ছে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস ২০২৬। এ বছরের প্রতিপাদ্যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা শোনা এবং তাঁদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর। মূল বার্তা—রোগীর কথা শুনতে হবে, তাঁর অভিজ্ঞতা বুঝতে হবে এবং সেই অনুযায়ী সেবাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতা কতটা উদ্বেগজনক? গবেষণার তথ্য বলছে, দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের বড় অংশই চিকিৎসার বাইরে রয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে মানসিক রোগের হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। এর মধ্যে পুরুষের হার ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীর ২১ দশমিক ৫ শতাংশ। শিশু-কিশোরদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশ।


সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রাপ্তবয়স্ক মানসিক রোগীদের প্রায় ৯২ দশমিক ৩ শতাংশ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান না বলে জরিপে উঠে এসেছে। অর্থাৎ, মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বিপুলসংখ্যক মানুষ চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। মানসিক রোগ নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার, চিকিৎসা সম্পর্কে অজ্ঞতা, পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞের অভাব, প্রয়োজনীয় সেবাকেন্দ্রের স্বল্পতা এবং চিকিৎসার ব্যয়—সব মিলিয়ে অনেক রোগী যথাযথ সহায়তা পাচ্ছেন না। অনেক পরিবার মানসিক সমস্যাকে শারীরিক অসুস্থতার মতো গুরুত্ব দেয় না। কেউ মনে করেন, সময়ের সঙ্গে সমস্যা নিজে থেকেই সেরে যাবে। আবার সমাজে নেতিবাচক পরিচয় পাওয়ার ভয়ে অনেকে চিকিৎসা নিতেও পিছিয়ে থাকেন।


বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সদস্যসচিব অধ্যাপক চিকিৎসক নিজাম উদ্দিন মনে করেন, মানসিক স্বাস্থ্যকে শুধু রোগের চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো এবং দক্ষ জনবল তৈরি করা জরুরি। তাঁর মতে, যেকোনো রোগ প্রতিরোধের ক্ষেত্রেই মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে হবে। বৈষম্যহীন ও মানবিক রাষ্ট্র গঠনেও মানসিক স্বাস্থ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা শুধু বড় শহর বা হাসপাতালকেন্দ্রিক রাখলে চলবে না। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত এই সেবা পৌঁছে দিতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক রোগ শনাক্তকরণ এবং প্রাথমিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে আরও অনেক মানুষকে চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব।


আকলিমার মতো কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রেও প্রয়োজন সময়মতো সঠিক মূল্যায়ন, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং পরিবারের সহায়তা। আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিকে দোষারোপ না করে তাঁর কথা শোনা এবং সম্মানের সঙ্গে পাশে দাঁড়ানো প্রয়োজন। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের বার্তাও সেটিই—মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ, চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ, পরিবারের সহানুভূতি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—এই তিনটির সমন্বয় ছাড়া মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯