বর্ষার পানি নামতেই চলনবিলে শুরু হয়েছে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহের হিড়িক। প্রতিদিন শত শত নৌকা নিয়ে বিলের বিভিন্ন

চলনবিলে অবাধে চলছে শামুক-ঝিনুক নিধন

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ১১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:২৬ সময় , আপডেট সময় : ১১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:২৬ সময়

বর্ষার পানি নামতেই চলনবিলে শুরু হয়েছে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহের হিড়িক। প্রতিদিন শত শত নৌকা নিয়ে বিলের বিভিন্ন এলাকায় চলছে এই সংগ্রহ। জীবিকার তাগিদে স্থানীয় দরিদ্র মানুষ এতে যুক্ত হলেও অতিরিক্ত শামুক-ঝিনুক নিধনের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে জলজ জীববৈচিত্র্য। অথচ যে শামুক মাছের খাদ্য জোগায়, জলাশয়ের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে, সেই শামুকই এখন নির্বিচারে তুলে নেওয়া হচ্ছে বিল থেকে।


সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার চলনবিলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ব্যাপকভাবে শামুক ও ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়। সাধারণত জুলাই থেকে অক্টোবর পর্যন্ত চলে এই কার্যক্রম। তবে এবার বর্ষার পানি দেরিতে নামায় আরও প্রায় এক মাস শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ চলতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়ভাবে হামকুড়িয়া, ঘরগ্রাম, কুন্দইল, কামাড়শোন, মাকড়শোন, নাদোসৈয়দপুর ও মাগুড়া বিনোদসহ প্রায় ২০ থেকে ২৫টি এলাকায় চলছে শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ। সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ নৌকা নিয়ে প্রতিদিন এই কাজে অংশ নিচ্ছেন স্থানীয় লোকজন। প্রতিদিন সংগ্রহ করা হচ্ছে প্রায় দুই থেকে তিন টন শামুক ও ঝিনুক।


এই সংগ্রহের পেছনে রয়েছে বড় একটি বাণিজ্যিক চক্র। স্থানীয় দরিদ্র কৃষক ও মৎস্যজীবীদের ছোট ছোট নৌকা দিয়ে শামুক সংগ্রহে সহায়তা করছেন ব্যবসায়ীরা। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত একজন সংগ্রহকারী তিন থেকে চার বস্তা শামুক তুলতে পারেন। প্রতি বস্তা শামুক বিক্রি হয় ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। সংগ্রহ করা শামুক স্থানীয় ব্যবসায়ীদের হাত ধরে পৌঁছে যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। কুষ্টিয়া, নোয়াখালী, বরিশাল, বাগেরহাট, যশোর ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকার মাছ ও হাঁসের খামারে এগুলো খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, চলনবিলে প্রতি বছর প্রায় কোটি টাকার শামুক কেনাবেচা হয়।


শামুক সংগ্রহকারী ইলিয়াস হোসেন জানান, বর্ষাকালে তাঁদের নিয়মিত কাজ থাকে না, চাষাবাদও বন্ধ থাকে। তাই জীবিকার প্রয়োজনে ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় শামুক সংগ্রহ করেন তাঁরা। এতে প্রতিদিন জনপ্রতি প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। অন্যদিকে শামুক-ঝিনুকের ব্যবসায়ী আব্দুল মমিন জানান, ছোট-বড় মিলিয়ে এ ব্যবসায় যুক্ত রয়েছেন ২০ থেকে ২৫ জন ব্যবসায়ী। তাঁরা সংগ্রহকারীদের কাছ থেকে শামুক কিনে বিভিন্ন জেলার আড়তে পাইকারি দরে বিক্রি করেন। বর্ষা মৌসুমের তিন থেকে চার মাস চলে এই কেনাবেচা।


তবে এই ব্যবসার আর্থিক দিকের আড়ালে পরিবেশ নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বিদ্যুৎ কুমারের মতে, শামুক ও ঝিনুক জলজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়ের মতো উন্মুক্ত জলাশয়ে এদের বংশবিস্তার ঘটে। জলাশয়ের ক্ষুদ্র প্রাণী ও জৈব পদার্থ খেয়ে এরা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি মিঠাপানির মাছের খাদ্যের চাহিদা পূরণেও শামুক গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর বক্তব্য, ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইনে শামুককে জলজ প্রাণী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। শামুক সংগ্রহের ক্ষেত্রে আইনগত বিধিনিষেধ ও শাস্তির বিধান থাকার কথা উল্লেখ করলেও আইন প্রয়োগের ঘাটতির কারণে নিধন বন্ধ হচ্ছে না বলে তিনি অভিযোগ করেন।


এদিকে তাড়াশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুসরাত জাহান জানিয়েছেন, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। শামুক-ঝিনুক সংগ্রহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজনে সংগ্রহকারী ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি। এখন প্রশ্ন হলো, একদিকে জীবিকার প্রয়োজনে শামুক সংগ্রহ, অন্যদিকে জলজ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় কীভাবে হবে? সংশ্লিষ্টদের মতে, কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা না থাকলে চলনবিলের শামুক-ঝিনুকের ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। এতে শুধু জলজ জীববৈচিত্র্য নয়, দীর্ঘমেয়াদে মাছের উৎপাদন ও স্থানীয় মানুষের জীবিকাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯