দিল্লিতে প্রতিবাদ করার জায়গা বদলে যাওয়ায় আন্দোলনকারীদের সামনে তৈরি হয়েছে নতুন বাধা। আগে যন্তর মন্তরে দাঁড়িয়ে সহজেই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যেত, কিন্তু সেই জায়গার অনুমোদন বাতিলের পর নির্ধারণ করা হয়েছে তিনটি বিকল্প স্থান। অভিযোগ উঠেছে, কোথাও প্রতিবাদের খরচ অনেক বেশি, কোথাও জনসমাগম ও যানজটের সমস্যা, আবার কোথাও যেতে পাড়ি দিতে হবে দীর্ঘ পথ। তাহলে কি দিল্লিতে আন্দোলন করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে?
নতুন নির্ধারিত তিনটি স্থান হলো রামলীলা ময়দান, সিবিডি ময়দান এবং বুরারি ময়দান। প্রতিটি জায়গারই রয়েছে আলাদা সীমাবদ্ধতা, যা ছোট সংগঠন থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলনকারীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। লুটিয়েন্স দিল্লির কাছাকাছি অবস্থিত ১২ একরের রামলীলা ময়দানে প্রতিবাদ আয়োজন করতে প্রতিদিন ৫০ হাজার রুপি বুকিং ফি দিতে হবে। এর পাশাপাশি জমা দিতে হবে ৫৫ হাজার রুপির জামানত, যা ফেরতযোগ্য নয়। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুরো ময়দান একসঙ্গে বুকিং করতে হয়। ফলে ছোট সংগঠনগুলোর জন্য এত টাকা খরচ করা কঠিন। আবার উৎসবের মৌসুমে এই মাঠের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় জায়গা পাওয়া নিয়েও প্রতিযোগিতা তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় বিকল্প সিবিডি ময়দান অবস্থিত দিল্লির শাহদারা এলাকায়। প্রায় ১২ একর আয়তনের এই জায়গাটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকা, বিপণিবিতান এবং হোটেল দিয়ে ঘেরা। ফলে সেখানে বড় ধরনের প্রতিবাদ আয়োজন করলে যানজটের সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে আন্দোলনের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করাও কঠিন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তৃতীয় বিকল্প বুরারি ময়দান আয়তনে সবচেয়ে বড়। প্রায় ৫০ একরের এই মাঠটি উত্তর-পশ্চিম দিল্লিতে অবস্থিত এবং যন্তর মন্তর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে। এই দূরত্ব নিয়েই সবচেয়ে বেশি আপত্তি আন্দোলনকারীদের একাংশের। তাঁদের অভিযোগ, শহরের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে এত দূরে প্রতিবাদের জায়গা সরিয়ে দিলে সাধারণ মানুষের দাবি সহজে নীতিনির্ধারকদের নজরে পৌঁছাবে না। এ কারণেই কেউ কেউ বুরারি ময়দানকে ‘খোলা জেলখানা’ বলে সমালোচনা করছেন।
লেখক ও শহর গবেষক সোহেল হাশমিও বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, আন্দোলনের কেন্দ্রকে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে এত দূরে সরিয়ে দেওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের সরকারের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরার সুযোগ সীমিত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলের সামনে প্রতিবাদের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। যন্তর মন্তর দীর্ঘদিন ধরে দিল্লিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের পরিচিত কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সেখানে প্রতিবাদ হলে গণমাধ্যমের নজর পাওয়া এবং নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা তুলনামূলক সহজ ছিল বলে মনে করেন আন্দোলনকারীরা।
কিন্তু বিকল্প স্থানগুলোর উচ্চ খরচ, দূরত্ব এবং ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে প্রতিবাদ আয়োজনের সুযোগ কতটা সহজ থাকবে, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে। এখন দেখার বিষয়, নতুন স্থানগুলো নিয়ে আন্দোলনকারীদের আপত্তির পর কর্তৃপক্ষ কোনো পরিবর্তন আনে কি না, নাকি দিল্লিতে প্রতিবাদের জন্য এই তিনটি স্থানই বহাল থাকে। কারণ, প্রতিবাদের জায়গা শুধু একটি মাঠ নয়—সেখানে মানুষের দাবি কতটা দৃশ্যমান হবে এবং সরকারের কাছে কতটা পৌঁছাবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।