মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স কমানোর চেষ্টা করছেন দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দলের নেতারা—এমন মন্তব্য করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। প্রযুক্তি যখন দ্রুত বদলে দিচ্ছে পৃথিবীকে, তখন মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর আলোচনা কেন সামনে আসছে? এই প্রশ্ন তুলে তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক নেতাদের যুক্তি জনসমক্ষে তুলে ধরার আহ্বান জানিয়েছেন।
সোমবার, ১২ অক্টোবর, রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে ‘হার স্কিলস, হার ফিউচার’ প্রকল্পের সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রতিমন্ত্রী। কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। ববি হাজ্জাজের দাবি, দেশের বড় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স কতটা কমানো যায়, তা নিয়ে তদবির করছেন। তবে কোন কোন নেতা এ বিষয়ে তদবির করছেন, সে বিষয়ে তিনি নির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করেননি। তাঁর মতে, বিয়ের বয়স কমানোর পক্ষে যাঁরা অবস্থান নিচ্ছেন, তাঁদের যুক্তি কী, তা জ্ঞানভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে সমাজের সামনে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের পাশাপাশি উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যমেরও দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বের সঙ্গে অতীতের সামাজিক বাস্তবতার তুলনা টেনে প্রতিমন্ত্রী বলেন, চার হাজার বছর আগের মিসর কিংবা আড়াই হাজার বছর আগের গ্রিসের সমাজব্যবস্থার সঙ্গে একবিংশ শতাব্দীর বাস্তবতা এক নয়। তাঁর মতে, ২০২৬ সালের মতো আধুনিক সময়েও মেয়েদের বিয়ের বয়স কমানোর আলোচনা হতাশাজনক।
অনুষ্ঠানে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, নারীর টেকসই ক্ষমতায়ন শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণ কিংবা কর্মসংস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নারীর আত্মবিশ্বাস তৈরি, যোগাযোগদক্ষতা বৃদ্ধি, নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা এবং পরিবার ও সমাজের মানসিকতার ইতিবাচক পরিবর্তনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধ করতে হলে এর পেছনে থাকা মূল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। পারিবারিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, সামাজিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা অনেক ক্ষেত্রে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ের দিকে ঠেলে দেয়। তাই এসব সমস্যা সমাধানে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে থাকা প্রান্তিক কিশোরী ও তরুণীদের দক্ষতা বাড়ানো এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, মেয়েরা নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ পেলে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করবে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপা শঙ্কর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনিসেফ বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী প্রতিনিধি জিলিয়ান মেলসপ এবং কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার বাংলাদেশ কার্যালয়ের পরিচালক জিহুন কিম। এ ছাড়া প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো এবং বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অনুষ্ঠানে অংশ নেন।
ববি হাজ্জাজের বক্তব্যের পর মেয়েদের বিয়ের ন্যূনতম বয়স কমানোর বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে কী আলোচনা চলছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে তিনি নির্দিষ্ট কোনো নেতার নাম বা প্রস্তাবের বিস্তারিত উল্লেখ করেননি। ফলে বিষয়টি নিয়ে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য এবং সরকারের অবস্থান কী হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে।