বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, বিপুল প্রতিরক্ষা বাজেট, অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান আর আকাশ প্রতিরক্ষার শক্তিশালী ব্যবস্থা—সবকিছু থাকার পরও কেন একের পর এক হামলার মুখে সৌদি আরব? মাত্র কয়েক হাজার ডলারের ড্রোন কীভাবে কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে চাপে ফেলছে? ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে এই সংঘাত এখন সৌদি আরবের সামরিক নিরাপত্তার পাশাপাশি অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে ঘিরে হামলার খবর সামনে আসার পর সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। প্রতিবেদনে রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার দাবি করা হয়েছে। তবে এসব হতাহতের তথ্য ও হামলার দায় সম্পর্কে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া জরুরি। তবু সৌদির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
এই উত্তেজনার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘদিনের সংঘাত। যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক তৎপরতা বাড়িয়েছে এবং সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে। অন্যদিকে, হুথিরা লোহিত সাগর উপকূলের কৌশলগত এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করার চেষ্টা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি বাহিনীর বিমান হামলার জবাবে হুথিরা সৌদির তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও পর্যটন অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি ও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
কিন্তু সৌদি আরবের মতো সামরিক শক্তিশালী দেশ কেন এই হামলা পুরোপুরি ঠেকাতে পারছে না? বিশ্লেষকদের মতে, এর অন্যতম কারণ হলো হুথিদের অসম যুদ্ধকৌশল। সৌদি আরবের হাতে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক এফ-১৫ যুদ্ধবিমান। কিন্তু প্রতিপক্ষের ব্যবহৃত তুলনামূলক কম খরচের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে অনেক বেশি ব্যয়বহুল প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয়।
অর্থাৎ, একটি সস্তা ড্রোন ধ্বংস করতে গিয়ে সৌদিকে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হতে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে এভাবে হামলা প্রতিহত করতে থাকলে অস্ত্রের মজুত ও প্রতিরক্ষা বাজেটের ওপর চাপ বাড়ে। এই ব্যয়ের অসমতাই হুথিদের কৌশলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো একসঙ্গে বিভিন্ন ধরনের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হামলা। নিচু দিয়ে উড়ে আসা ড্রোন, দ্রুতগতির ক্ষেপণাস্ত্র এবং একাধিক দিক থেকে আসা লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে প্রতিহত করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে। কোনো কোনো হামলা প্রতিহত করা গেলেও একটি বা দুটি অস্ত্র লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে গেলে বড় ধরনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে।
এর পাশাপাশি রয়েছে আঞ্চলিক ভূরাজনীতি। দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের মধ্য দিয়ে হুথিরা ইয়েমেনের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ইরানের কাছ থেকে তারা অস্ত্র ও প্রযুক্তিগত সহায়তা পায় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়। তবে তাদের নির্দিষ্ট সামরিক সক্ষমতা ও বাইরের সহায়তার পরিমাণ নিয়ে সব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়।
সামরিক শক্তির তুলনায় সৌদি আরব অনেক এগিয়ে থাকলেও হুথিদের কৌশলগত অবস্থান এবং দীর্ঘদিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সংঘাতকে জটিল করে তুলেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা ব্যয় বিপুল হলেও আধুনিক অস্ত্রের জন্য দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো পশ্চিমা সরবরাহকারীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অন্যদিকে, হুথিরা তুলনামূলক কম ব্যয়ে হামলার সক্ষমতা ধরে রেখে সৌদির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে চাপে ফেলতে চাইছে।
এই সংঘাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রিয়াদের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার আওতায় রিয়াদকে পর্যটন, ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানের বড় কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ চলছে। এমন সময়ে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দর হামলার ঝুঁকিতে পড়লে বিদেশি বিনিয়োগকারী, পর্যটক ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থায় প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথিদের প্রতিটি হামলায় বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি ঘটানো জরুরি নয়। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারলেও তারা কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। আর সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষা করা, অন্যদিকে ইয়েমেনের সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে এগিয়ে নেওয়া।
সব মিলিয়ে, সৌদি আরব ও হুথিদের এই সংঘাত শুধু ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের লড়াই নয়; এটি ব্যয়, কৌশল, আঞ্চলিক প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও পরীক্ষা। এখন বড় প্রশ্ন, সৌদি আরব কি তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করে এই হামলার ঝুঁকি কমাতে পারবে, নাকি ইয়েমেনের সংঘাত দেশটির নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপর আরও দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করবে?