বিচার বিভাগ কতটা স্বাধীন হবে, সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষেত্রে তার ক্ষমতার সীমা কোথায় থাকবে, আর রাষ্ট্রের অন্য অঙ্গগুলোর সঙ্গে ক্ষমতার ভারসাম্য কীভাবে নিশ্চিত করা হবে—সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় এবার উঠে এসেছে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। একই সঙ্গে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার, সংসদের উচ্চকক্ষ এবং জনগণের মৌলিক অধিকার নিয়েও নতুন প্রস্তাব দিয়েছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় এসব মতামত তুলে ধরা হয়। বৈঠকটি ছিল কমিটির সপ্তম সভা। এতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ভূমিকা রাখা শিক্ষক সমাজের প্রতিনিধি, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং বিশিষ্ট শিক্ষাবিদেরা অংশ নেন। বৈঠক শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ জানান, রাষ্ট্রের একটি অঙ্গ যেন অন্য অঙ্গের ওপর অযাচিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে সংবিধানের ব্যাখ্যা ও মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিষয়ে এর এখতিয়ার সাংবিধানিকভাবে স্পষ্ট করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় জনগণের প্রত্যাশাও যেন যথাযথভাবে বিবেচনায় থাকে, সে বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন আলোচকেরা।
সভায় সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি, জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো আলোচনায় আসে। সংবিধানের রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয়কে মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও দিয়েছেন কয়েকজন শিক্ষাবিদ। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংশোধনের বর্তমান পদ্ধতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের সুযোগ কীভাবে নিশ্চিত করা যায়, তা নিয়ে মতামত দিয়েছেন অংশগ্রহণকারীরা। দুই-তৃতীয়াংশ সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার বাইরে বিকল্প কোনো পদ্ধতি রাখা সম্ভব কি না, সেই প্রশ্নও আলোচনায় উঠে এসেছে। পাশাপাশি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিলুপ্ত সংবিধানের মৌলিক কাঠামোসংক্রান্ত বিধান নিয়েও মতামত দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা এবং সরকার গঠনের প্রক্রিয়াও ছিল আলোচনার অন্যতম বিষয়। এ বিষয়ে কয়েকজন লিখিত প্রস্তাব দেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে বৈঠকে কোনো নির্দিষ্ট প্রস্তাব চূড়ান্ত হয়নি। বিশেষ কমিটির সভাপতি জানান, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিকল্প পদ্ধতিগুলোর মধ্যে আগের বিকল্পগুলোতে ঐকমত্য না হলে সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে বিচার বিভাগের ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচকদের মতামত পাওয়া গেছে। এদিকে, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়েও বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। সেখানে কোন শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিনিধিত্ব থাকবে, প্রতিনিধিরা কীভাবে নির্বাচিত হবেন, জেলাভিত্তিক প্রতিনিধিত্ব রাখা হবে কি না এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা চালু করা যায় কি না—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন শিক্ষাবিদেরা। পাশাপাশি সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে জনগণের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করার প্রস্তাবও এসেছে।
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ না থাকা প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে কাজ করছে এবং বিরোধী দলের নেতাদের কমিটিতে সদস্য মনোনয়নের জন্য আহ্বান জানানো হয়েছে। তারা নাম দিলে স্বাগত জানানো হবে বলেও জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিরোধী দল অংশ না নিলেও সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ এগিয়ে নিতে হবে। তবে সরকার ও বিরোধী দলসহ সব পক্ষের সমঝোতার ভিত্তিতে সংশোধন সম্পন্ন করাই তাদের প্রত্যাশা।
কমিটির প্রতিবেদন তৈরির পর সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপিত হলে বিরোধী দল তাতে অংশ নেবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। বিরোধী দল চাইলে লিখিত মতামতও দিতে পারবে বলে জানান কমিটির সভাপতি। সব মিলিয়ে সংবিধান সংশোধনের আলোচনায় বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, ক্ষমতার ভারসাম্য, নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা, সংসদের উচ্চকক্ষ এবং মৌলিক অধিকার—এসব বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তবে শিক্ষাবিদদের প্রস্তাবগুলোর কোনগুলো চূড়ান্ত সংশোধনীতে অন্তর্ভুক্ত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।