ঘাসের ডগায় জমে থাকা স্বচ্ছ শিশির, মাঠজুড়ে দুলতে থাকা পাকা ধানের শিষ, ভোরের কুয়াশা আর বিকেলের সোনাঝরা রোদ—প্রকৃতির

হেমন্ত এলো ধূসর বিবর্ণে, হিমেল হাওয়ায়

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৩ সময় , আপডেট সময় : ১৭ অক্টোবর ২০২৬, সকাল ৯:৪৩ সময়

ঘাসের ডগায় জমে থাকা স্বচ্ছ শিশির, মাঠজুড়ে দুলতে থাকা পাকা ধানের শিষ, ভোরের কুয়াশা আর বিকেলের সোনাঝরা রোদ—প্রকৃতির এমন অপরূপ সাজ নিয়েই বাংলার বুকে হাজির হয়েছে হেমন্ত। ঋতুর এই পরিবর্তনে একদিকে যেমন শীতের মিষ্টি আমেজ ছড়িয়ে পড়ছে গ্রামবাংলায়, অন্যদিকে মাঠে মাঠে শুরু হচ্ছে সোনালি ফসল ঘরে তোলার প্রস্তুতি। আজ পয়লা কার্তিক, বাংলা ঋতুচক্রে হেমন্তের আগমনী বার্তা।


বাংলার ষড়্ঋতুর পরিক্রমায় শরতের পর আসে হেমন্ত। কার্তিক ও অগ্রহায়ণ—এই দুই মাস নিয়ে গঠিত এ ঋতু। হেমন্তের সকালে ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু, কুয়াশায় ঢাকা পথঘাট আর নীল আকাশের নিচে সবুজ-হলুদে রাঙানো মাঠ প্রকৃতিকে দেয় এক ভিন্ন সৌন্দর্য। দিনের বেলায় সোনালি রোদ থাকলেও সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসে বাড়তে থাকে শীতের অনুভূতি। রাতের নিস্তব্ধতায় শিশির ঝরে, আর ভোরের হিমেল হাওয়া জানান দেয় শীতের আগমনের কথা। কবির কল্পনায় হেমন্তের এই রূপ যেন আরও মায়াবী। জীবনানন্দ দাশের কবিতায় শিশিরভেজা সন্ধ্যা, কুয়াশার আবরণ আর দিনের শেষে নিস্তব্ধ প্রকৃতি এক গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়। আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতায় হেমন্তের কুয়াশা, মলিন সন্ধ্যাপ্রদীপ আর সোনালি ধানের সমারোহ ফুটে উঠেছে ভিন্ন আবহে। প্রকৃতির সৌন্দর্য আর মৃদু বিষাদের মিশেলে হেমন্ত হয়ে ওঠে এক অনন্য ঋতু।


তবে হেমন্ত শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের ঋতু নয়, বাংলার কৃষি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গেও এর সম্পর্ক গভীর। একসময় কার্তিক মাসকে বলা হতো ‘মরা কার্তিক’। এ সময়ে অনেক অঞ্চলে ফসলের অভাব দেখা দিত, ফুরিয়ে যেত কৃষকের গোলার ধান, দেখা দিত খাদ্যসংকট। বর্ষা ও শরতের অনিয়মিত বৃষ্টির প্রভাবেও কৃষিকাজ ব্যাহত হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে সেই চিত্র। আধুনিক কৃষি, উন্নত চাষাবাদ ও একাধিক ফসল উৎপাদনের কারণে এখন অনেক এলাকাতেই কার্তিক মাসে আমন ধান পাকার দৃশ্য দেখা যায়।


হেমন্তের আরেক আকর্ষণ গ্রামবাংলার জলাশয় ও জীববৈচিত্র্য। বর্ষার পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলে খাল-বিল ও জলাশয়ে মাছ ধরার উৎসব জমে ওঠে। জাল, পলো কিংবা অন্যান্য দেশি উপকরণ নিয়ে মাছ ধরতে বেরিয়ে পড়েন গ্রামের মানুষ। শুকিয়ে আসা জলাশয়ের পাশে ফুটে থাকা ফুল, মাঠের আলপথে বুনো গাছপালা আর পাখির কলকাকলি গ্রামীণ জীবনকে করে তোলে প্রাণবন্ত। কার্তিকের পর আসে অগ্রহায়ণ। আর এই মাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাঙালির অন্যতম প্রাচীন কৃষিভিত্তিক উৎসব নবান্ন। মাঠের পাকা ধান কেটে কৃষক যখন নতুন ফসল ঘরে তোলেন, তখন গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে শুরু হয় আনন্দের আয়োজন। নতুন চালের ভাত, পিঠা-পায়েস আর আত্মীয়স্বজনের মিলনমেলায় মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। ‘নবান্ন’ শব্দের অর্থই নতুন অন্ন। নতুন ধান ঘরে তোলার আনন্দকে ঘিরে গড়ে উঠেছে বাংলার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি।


তবে প্রকৃতির এই চিরচেনা রূপেও পরিবর্তনের ছাপ পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঋতুর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনেক সময় বদলে যাচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান এবং উত্তরের শীতল বাতাসের প্রভাবে ধীরে ধীরে বাড়বে শীতের অনুভূতি। তবে আবহাওয়ার অনিয়মের কারণে শীতের আগমন ঠিক কতটা দ্রুত হবে, তা নির্ভর করবে প্রকৃতির পরিবর্তিত পরিস্থিতির ওপর। সব মিলিয়ে শিশিরভেজা সকাল, কুয়াশামাখা সন্ধ্যা, সোনালি ধান আর নবান্নের আনন্দ নিয়ে আবারও এসেছে হেমন্ত। প্রকৃতির সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই ঋতু মনে করিয়ে দেয় বাংলার কৃষি, লোকজ সংস্কৃতি ও হাজার বছরের ঐতিহ্যের কথা। শীতের আগমনী বার্তা নিয়ে হেমন্ত এখন গ্রামবাংলার মাঠে-ঘাটে, মানুষের জীবনে আর কবিতার পঙ্‌ক্তিতে ছড়িয়ে দিচ্ছে এক মায়াময় আবহ।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯