ইংল্যান্ডের একটি পার্কে হাঁটতে গিয়ে হঠাৎই হেনস্তার শিকার হলেন ভারতীয় তিন শিক্ষার্থী। তাদের ঘিরে ধরে ক্যামেরায় ভিডিও ধারণ, ইংল্যান্ডে আসার কারণ জানতে চাওয়া, এমনকি ভবিষ্যতে ওই পার্কে আর না আসার হুমকিও দেওয়া হয়। নিজেদের নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার জন্য কাজ করা দল বলে দাবি করলেও, তাদের এই আচরণ নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। স্থানীয় কর্মীদের অভিযোগ, শিক্ষার্থীদের জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়ে থাকতে পারে।
ঘটনাটি ঘটেছে ইংল্যান্ডের সোলিহালের মেরিডেন পার্কে। সেখানে ‘চেলমসলে উড প্যাট্রিয়টস’ নামের একটি স্বঘোষিত পাহারাদার দলের সদস্যরা টহল দেওয়ার সময় ভারতীয় তিন শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। দলটির নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাব থেকে ভিডিওটি সরিয়ে নেওয়া হলেও অন্য জায়গায় তা ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, দলের এক সদস্য শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করছেন, তারা ইংল্যান্ডে কেন এসেছেন। জবাবে একজন জানান, তারা সাধারণত বার্মিংহামে থাকেন এবং সেদিন ওই এলাকায় এসেছেন। আরেক শিক্ষার্থী বলেন, স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য তিনি ইংল্যান্ডে এসেছেন এবং সেখানে দুই বছর ধরে বসবাস করছেন।
কিন্তু কথোপকথন একপর্যায়ে হুমকির দিকে মোড় নেয়। শিক্ষার্থীদের বলা হয়, শিশুদের খেলার জায়গা থেকে দূরে থাকতে এবং ভবিষ্যতে যেন ওই পার্কে আর তাদের দেখা না যায়। এমনকি নিজেদের বাড়িতে ফিরে যাওয়ার কথাও বলা হয়। দলের এক সদস্য তাদের সতর্ক করে বলেন, ওই পার্কে আর না আসাই উচিত। ঘটনার পর নিজেদের অবস্থানের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছে দলটি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তাদের দাবি, ওই এলাকায় শিশু নিখোঁজ হওয়া এবং ধর্ষণের ঘটনার খবর পাওয়ার পর তারা টহল শুরু করেছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাতে পার্কের গাছপালা ও শৌচাগারের কাছাকাছি তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষকে দেখতে পেয়ে তারা এগিয়ে যায়।
দলটি আরও দাবি করেছে, অন্ধকারে পার্কে অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে ওই ব্যক্তিরা ঘুরতে আসার কথা জানান। এরপর তাদের বক্তব্য ভিডিও ধারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলের দাবি, শিক্ষার্থীদের তারা বিনয়ের সঙ্গে পার্ক ছেড়ে চলে যেতে বলেছিল। পার্কটি শিশু ও পরিবারের জন্য, তাই রাতের বেলায় সেখানে তিনজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের অবস্থান এবং ভিডিও ধারণ নিয়ে তাদের উদ্বেগ ছিল বলে জানায় দলটি। তবে শিক্ষার্থীদের এভাবে ঘিরে ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কর্মীরা। তাদের অভিযোগ, নিরাপত্তার কথা বলা হলেও শিক্ষার্থীদের জাতিগত পরিচয়ের কারণে তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়ে থাকতে পারে। সোলিহাল গ্রিন পার্টিও ঘটনাটির নিন্দা জানিয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই ঘটনা যুক্তরাজ্যে অভিবাসী ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা, জনসমাগমস্থলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং স্বঘোষিত পাহারাদার দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে। কোনো এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো এক বিষয়, আর ব্যক্তিগতভাবে কাউকে পরিচয় বা জাতীয়তার ভিত্তিতে প্রশ্নবাণে জর্জরিত করে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়া আরেক বিষয়। এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—নিরাপত্তার নামে এমন আচরণের সীমা কোথায়? আর জনসাধারণের পার্কে চলাফেরা করতে গিয়ে কোনো শিক্ষার্থী বা অভিবাসীকে যেন হয়রানির শিকার হতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই নজর থাকবে।