ইয়েমেনের হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সৌদি আরবকে সহায়তার প্রস্তাব যদি সত্যি হয়, তাহলে সেটিকে নিছক সামরিক সহযোগিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত হিসাব, যা ভবিষ্যতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক অবস্থানকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। এমনই সতর্কবার্তা দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশ্লেষক তামের আজরামি। তাঁর মতে, সৌদি আরবকে রক্ষার অজুহাতে ইয়েমেন সংঘাতে ইসরায়েলের প্রবেশ পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার সমীকরণ বদলে দিতে পারে।
তামের আজরামির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইসরায়েলের লক্ষ্য কেবল সৌদি আরবকে ইয়েমেনি ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি থেকে রক্ষা করা নয়। বরং উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাব্যবস্থায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করা এবং সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়াকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করাও এর পেছনে থাকতে পারে। আর এ কারণেই সৌদি আরবের এমন প্রস্তাব গ্রহণের আগে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিণতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশ্লেষকের আশঙ্কা, ইসরায়েল যদি সৌদি আরবকে সহায়তার নামে ইয়েমেন যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সৌদি আরবের প্রতিপক্ষরা এই পরিস্থিতিকে নিজেদের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। তারা দাবি করতে পারে, সৌদি আরব আর এককভাবে লড়ছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইয়েমেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। এতে হুতিদের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার পাশাপাশি সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এখানে বড় প্রশ্ন হলো, ইয়েমেনের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইসরায়েল নিজেই কতটা সফল? তামের আজরামির যুক্তি, ইয়েমেন থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের হুমকি পুরোপুরি ঠেকাতে ইসরায়েল ব্যর্থ হয়েছে। হোদাইদাহ বন্দরে হামলা চালানোর পরও লোহিত সাগরের অস্থিতিশীলতা পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে ইসরায়েলের এইলাত বন্দরের কার্যক্রমও সংকটের মুখে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইসরায়েল কীভাবে সৌদি আরবকে সম্পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
বিশ্লেষকের মতে, সৌদি আরবের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু সামরিক নিরাপত্তা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎও। সৌদি আরব নিজেদের একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল বিনিয়োগকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। জ্বালানি খাতের পাশাপাশি নতুন অর্থনৈতিক খাত গড়ে তোলা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করাও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কিন্তু নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কা, বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তাঝুঁকি এবং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের পরিস্থিতি সেই পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
তামের আজরামির মতে, ইয়েমেন সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে সৌদি আরবের স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রতিটি হামলা বড় ধরনের সামরিক ক্ষতি না করলেও মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুর্বল করে দিতে পারে। ফলে যুদ্ধের বোঝা শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়বে অর্থনীতি ও আঞ্চলিক নেতৃত্বের ওপরও। এদিকে, বিশ্লেষক মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাতকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন বাড়লে ইসরায়েল কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। গাজা, পশ্চিম তীর, দক্ষিণ লেবানন, সিরিয়া এবং ইয়েমেনকে ঘিরে চলমান উত্তেজনার মধ্যে আরব দেশগুলো নিজেদের মধ্যে বিরোধে জড়িয়ে পড়লে আঞ্চলিক ঐক্য দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে তামের আজরামি এটাও স্পষ্ট করেছেন, এর অর্থ এই নয় যে হুতিদের কোনো দায় নেই কিংবা ইরানের কোনো প্রভাব নেই। সৌদি আরবের নিজের সীমান্ত, শহর, অবকাঠামো ও জনগণকে রক্ষা করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কিন্তু নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অর্থ এই নয় যে দেশটিকে অনির্দিষ্টকালের জন্য একটি ক্ষয়িষ্ণু যুদ্ধে আটকে থাকতে হবে। তাহলে সমাধান কী? বিশ্লেষকের মতে, সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে সংঘাত কমানোর উদ্যোগ নেওয়া, ইয়েমেনের সঙ্গে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা শুরু করা, অনাগ্রাসন চুক্তির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা, সীমান্ত সুরক্ষিত করা এবং লোহিত সাগরে নিরাপদ নৌচলাচল নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে ওমানের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আঞ্চলিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় ইরানকেও আলোচনার আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সবশেষে তামের আজরামির মূল সতর্কবার্তা হলো, সৌদি-ইয়েমেন সংঘাতকে যদি সৌদি-ইসরায়েলি সামরিক সংঘাতে রূপ দেওয়া হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। এতে সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার বদলে নতুন শত্রুতা, রাজনৈতিক চাপ এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। তাঁর মতে, সৌদি আরবের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন একটি আঞ্চলিক নীতি গ্রহণ করা, যা যুদ্ধের পরিধি বাড়ানোর বদলে সংঘাত কমাবে, নিরাপত্তা জোরদার করবে এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথ সুগম করবে। এখন দেখার বিষয়, সৌদি আরব ভবিষ্যতে সামরিক সহযোগিতার পথ বেছে নেয়, নাকি আলোচনার মাধ্যমে ইয়েমেন সংকটের স্থায়ী সমাধানের দিকে এগিয়ে যায়।