দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, শান্তি আর পারস্পরিক শ্রদ্ধা কে না চান? কিন্তু সময়ের সঙ্গে ভুল-বোঝাবুঝি, অভিমান কিংবা মানসিক দূরত্ব অনেক সময় স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে কঠিন করে তোলে। ইসলামি জীবনদর্শনে এমন পরিস্থিতিতে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া এবং সুন্দর দাম্পত্যের জন্য দোয়া করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। পবিত্র কোরআনে এমন একটি দোয়া শেখানো হয়েছে, যেখানে শুধু জীবনসঙ্গীর ভালোবাসাই নয়, সন্তানদের চোখের শীতলতা এবং পুরো পরিবারকে সৎকর্মশীলদের জন্য আদর্শ হিসেবে গড়ে তোলার প্রার্থনাও রয়েছে।
দোয়াটি রয়েছে পবিত্র কোরআনের সুরা ফুরকানের ৭৪ নম্বর আয়াতে। সেখানে মুমিনদের শেখানো হয়েছে—
আরবি উচ্চারণ: রব্বানা হাব লানা মিন আজওয়াজিনা ওয়া জুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ‘ইউনিওঁ ওয়াজ‘আলনা লিলমুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ: “হে আমাদের প্রতিপালক, আমাদের জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের আমাদের জন্য নয়নপ্রীতি বানিয়ে দাও এবং আমাদের সৎকর্মশীলদের জন্য অনুসরণীয় নেতা বানিয়ে দাও।”
এই দোয়ায় রয়েছে একটি সুন্দর ও অর্থবহ পরিবারের আকাঙ্ক্ষা। এখানে শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসা বৃদ্ধির কথা বলা হয়নি; বরং এমন জীবনসঙ্গী ও সন্তান পাওয়ার প্রার্থনা করা হয়েছে, যাঁদের দেখে হৃদয় প্রশান্তিতে ভরে ওঠে এবং যাঁরা নৈতিকতা ও সৎকর্মের মাধ্যমে অন্যদের জন্যও উদাহরণ হয়ে ওঠেন।
কোরআনের সুরা রুমের ২১ নম্বর আয়াতেও দাম্পত্য সম্পর্কের মূল সৌন্দর্য তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষের মধ্য থেকেই তাদের জীবনসঙ্গী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তারা একে অপরের কাছে প্রশান্তি পায়। আর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।
অর্থাৎ ইসলামি দৃষ্টিতে দাম্পত্য সম্পর্ক শুধু একসঙ্গে বসবাসের নাম নয়। এই সম্পর্কের ভিত্তি হলো মানসিক প্রশান্তি, ভালোবাসা, দয়া, দায়িত্ববোধ এবং পারস্পরিক সম্মান। সুখের সময়ে যেমন একে অপরের পাশে থাকা প্রয়োজন, তেমনি কঠিন সময়েও ধৈর্য ধরে সম্পর্কের যত্ন নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
সুরা ফুরকানের আয়াতে ব্যবহৃত ‘কুররাতা আ‘ইউন’ শব্দবন্ধটির অর্থ হলো চোখের শীতলতা বা নয়নপ্রীতি। পারিবারিক জীবনে এর তাৎপর্য হচ্ছে—জীবনসঙ্গী কিংবা সন্তানকে দেখে এমন আনন্দ ও প্রশান্তি অনুভব করা, যা মানুষের মনের ক্লান্তি ও দুশ্চিন্তা অনেকটা দূর করে দেয়।
ইসলামি ব্যাখ্যায় একজন মুমিনের জন্য জীবনসঙ্গীকে আল্লাহর অনুগত, চরিত্রবান ও সৎকর্মশীল হিসেবে দেখতে পাওয়া বড় এক প্রশান্তির বিষয়। কারণ একটি সুন্দর পরিবার শুধু বাহ্যিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে নৈতিকতা, বিশ্বাস, দায়িত্ববোধ এবং একে অপরের প্রতি আন্তরিকতা।
এই দোয়ার শেষ অংশটিও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সেখানে সৎকর্মশীলদের জন্য অনুসরণীয় হওয়ার প্রার্থনা করা হয়েছে। এর অর্থ শুধু নেতৃত্ব বা সম্মান অর্জন নয়; বরং নিজের আচরণ, সততা, বিনয় ও দয়ার মাধ্যমে এমন উদাহরণ তৈরি করা, যা দেখে অন্যরাও ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত হয়।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সুন্দর হলে তার ইতিবাচক প্রভাব সন্তানদের ওপরও পড়তে পারে। পরিবারের মধ্যে সম্মানজনক আচরণ, সহনশীলতা এবং ভালোবাসার পরিবেশ শিশুদের মানসিক বিকাশে সহায়ক হয়। তাই একটি আদর্শ পরিবার গড়ে তোলার প্রার্থনা ব্যক্তিগত সুখের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণের সঙ্গেও যুক্ত।
কখন এই দোয়া পড়বেন? ফরজ নামাজের পর মোনাজাতে, দিনের যেকোনো সময়ে কিংবা ব্যক্তিগত ইবাদতের সময় আন্তরিকভাবে এই দোয়া করা যায়। সংসারে মতবিরোধ বা মানসিক দূরত্ব তৈরি হলে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার পাশাপাশি ধৈর্য ধরে কথা বলা, ভুল বোঝাবুঝি দূর করা এবং একে অপরের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়াও জরুরি।
ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর প্রতি সদাচরণের গুরুত্বও বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সহিহ বুখারির একটি হাদিসে এসেছে, পরিবারের জন্য ব্যয় করা সম্পদেরও সওয়াব রয়েছে—এমনকি স্ত্রীর মুখে খাবারের লোকমা তুলে দেওয়ার মধ্যেও প্রতিদানের কথা বলা হয়েছে।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, দোয়া মুমিনের জীবনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তবে সুন্দর দাম্পত্য গড়ে তুলতে প্রার্থনার পাশাপাশি প্রয়োজন আন্তরিকতা, বিশ্বস্ততা, দায়িত্বশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মান। জীবনসঙ্গী ও সন্তানদের জন্য চোখের শীতলতা কামনা করার এই কোরআনি দোয়া তাই শুধু মুখে উচ্চারণের বিষয় নয়; বরং একটি শান্তিপূর্ণ, ভালোবাসাপূর্ণ ও সৎ পরিবার গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষাও বহন করে।