কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে আনন্দভ্রমণে এসে এক মুহূর্তেই সবকিছু হারিয়ে গেল! চোখের সামনে দাউদাউ করে জ্বলছে তিনতলা কাঠের রিসোর্ট, চারদিকে আতঙ্ক আর বাঁচার আকুতি। ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন ১০ পর্যটক। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের ছয়জন, যাঁরা এসেছিলেন একসঙ্গে ছুটি কাটাতে। কিন্তু তাঁদের সেই ভ্রমণ শেষ হলো এক হৃদয়বিদারক ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে। এখন বড় প্রশ্ন, কীভাবে লাগল এই আগুন, আর পর্যটকদের নিরাপদে বের হওয়ার ব্যবস্থা কি আদৌ ছিল?
শনিবার, ১৭ অক্টোবর সকালে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক সৈকতে মেরিন ড্রাইভ সড়কের পাশে অবস্থিত টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে। তিনতলা কাঠের ভবনটিতে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ভেতরে থাকা অনেক পর্যটক বের হওয়ার সুযোগ পাননি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে একে একে মরদেহ বের করে আনা হয়। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকার বনশ্রী এলাকার একই পরিবারের ছয় সদস্য—ইসরাত জাহান মালিহা, মিলিতা মেহেজাবিন আলভী, লায়লা জাহান নাবিলা, নাফিসতা মীম, ফারিহা কবির এবং পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ। একই পরিবারের এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়ার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে স্বজনদের মধ্যে।
এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন নাসরিন আক্তার মুক্তা নামে ২৯ বছর বয়সী এক স্কুলশিক্ষক। তিনি ঢাকার আশুলিয়ার স্বপ্নবিলাস নিরিবিলি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। নিহত অপর দুই পর্যটকের নাম জিহাদ হাওলাদার ও আকিবুল ইসলাম বলে জানা গেছে। এই ভয়াবহ ঘটনায় সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন আশিকুল ইসলাম। স্ত্রীসহ শ্বশুরবাড়ির ছয় স্বজনকে হারিয়ে তিনি শোকে ভেঙে পড়েছেন। ঢাকার বনশ্রী থেকে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি। গত বৃহস্পতিবার তাঁরা কক্সবাজারে পৌঁছান। পরিকল্পনা ছিল শনিবারই ঢাকায় ফিরে যাওয়ার। কিন্তু সেই ফেরার দিনই নেমে আসে ভয়াবহ বিপর্যয়।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আশিকুল জানান, সকালে আগুন দেখে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দেন। এরপর পাশের কক্ষে থাকা স্বজনদের সতর্ক করতে যান তিনি। একপর্যায়ে জানালা ভেঙে নিচে লাফ দিয়ে প্রাণে বাঁচতে পারলেও স্ত্রীকে আর উদ্ধার করতে পারেননি। স্বজনদের হারানোর এই বেদনা তাঁর জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। এদিকে আগুন লাগার সঠিক কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আগুনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ জানিয়েছেন, রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তার ছাড়পত্র ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশও দেওয়া হয়েছিল। তিনতলা কাঠের এই ভবনের নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ, আর ওপরের দুই তলায় পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা। প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা ও অনুমোদন ছাড়া এ ধরনের স্থাপনা পরিচালনা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, এই দুর্ঘটনার পর তা নতুন করে সামনে এসেছে।
ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে আগুনের সূত্রপাত কোথা থেকে, প্রাণহানি এত বেশি হওয়ার কারণ কী, রিসোর্টটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছিল কি না এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পর্যটকদের বেরিয়ে যাওয়ার পর্যাপ্ত পথ ও ব্যবস্থা ছিল কি না। দশটি প্রাণহানি, একই পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যু আর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন—সব মিলিয়ে ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, পর্যটনকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিয়েও বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। এখন সবার অপেক্ষা তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য। সেই প্রতিবেদনে কি বেরিয়ে আসবে আগুনের প্রকৃত কারণ এবং এই মর্মান্তিক প্রাণহানি ঠেকানো সম্ভব ছিল কি না—তার উত্তর মিলবে তদন্ত শেষ হলেই।