মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলন, এমনকি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান—দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একসঙ্গে লড়াই করেছে। এবার দেশ গড়ার ক্ষেত্রেও সেই ঐক্য ধরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্য, দেশের নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার সমান, তাই ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়তে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
রোববার, ১৮ অক্টোবর রাতে রাজধানীর মহাখালী এবং গুলশান-বনানী এলাকার দুর্গাপূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের মানুষ ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা না করেই স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান—দেশকে ভালোবাসেন এমন মানুষ একসঙ্গে সংগ্রাম করে বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন।
তারেক রহমান আরও বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে যখন গণতন্ত্র হুমকির মুখে পড়েছে, তখন মানুষ ভোটাধিকার ও কথা বলার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথে নেমেছে। এসব আন্দোলনেও মানুষের ধর্মীয় পরিচয় ঐক্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ তুলে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেই সময়ও দলমত নির্বিশেষে নারী-পুরুষ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একসঙ্গে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কে কোন ধর্মের অনুসারী, তা বিবেচনা না করে সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গণঅভ্যুত্থানকে সফল করতে ভূমিকা রেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
দেশ গড়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায়ও একই ধরনের ঐক্য প্রয়োজন বলে মনে করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষায়, স্বাধীনতা অর্জন এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মানুষ যেমন ধর্মীয় পরিচয়কে প্রাধান্য দেয়নি, তেমনি আগামী দিনে দেশ গড়ার কাজেও ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের পরিবর্তে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে সবার পরিচয় অভিন্ন। এই দেশের ওপর প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার বাস্তবায়ন করতে হলে সব ধর্ম ও পেশার মানুষকে একসঙ্গে কাজ করে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।
বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, এ দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করে আসছেন। ভবিষ্যতের বাংলাদেশেও যেন সব ধর্মের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করতে পারেন, সেটিই হওয়া উচিত সবার প্রত্যাশা। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী চিকিৎসক জুবাইদা রহমান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন। রাতে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী মহাখালীর রক্ষাকালী মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন। সেখানে পূজা উদ্যাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তিনি। পরে বনানীর পূজামণ্ডপে গিয়ে পূজারি ও দর্শনার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাঁদের শুভেচ্ছা জানান।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে একটি মূল বার্তা—দেশের ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রামগুলোতে মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ ছিল, তেমনি ভবিষ্যতের উন্নয়ন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতেও প্রয়োজন সবার অংশগ্রহণ। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হলেও নাগরিক অধিকার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।