আগামী নভেম্বরে চীনের শেনজেন শহরে এশিয়া-প্যাসিফিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা (এপেক) সম্মেলনকে ঘিরে বিশ্বনেতাদের সমাগমের প্রস্তুতি চলছে। একই সঙ্গে আলোচনায় উঠে এসেছে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের বিষয়টি। তবে আন্তর্জাতিক বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাস্তবে এমন কোনো বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। ২০১৯ সালে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক শীর্ষ বৈঠক কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই ভেস্তে যাওয়ার পর প্রায় ৬০ ঘণ্টার দীর্ঘ ট্রেন ভ্রমণ শেষে খালি হাতে দেশে ফিরতে হয়েছিল উত্তর কোরিয়ার নেতাকে।তবে এবারের দৃশ্যপট পুরোপুরি ভিন্ন। ডোনাল্ড ট্রাম্প এই বৈঠকের বিষয়ে বারংবার আগ্রহ দেখালেও উত্তর কোরিয়া সরকার সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে।গত সপ্তাহেও ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, আগামী মাসে এশিয়া সফরের সময় কিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ হতেও পারে এবং সেটি বেশ চমৎকার অভিজ্ঞতা হবে।
কিন্তু সিউলভিত্তিক বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, সোমবার নিজের অবস্থান কিছুটা পরিবর্তন করে ট্রাম্প বলেন, "আমি নিশ্চিত নই... কেউ বৈঠকের আবেদন করছে কি না তাও আমার জানা নেই।" তবে একই সঙ্গে কিমের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কথা আবারও মনে করিয়ে দেন তিনি। দুই রাজনীতিবিদের মুখোমুখি হওয়া মানেই সংবাদ মাধ্যমে বড় ধরনের আলোচনা। তবে সম্প্রতি রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে পিয়ংইয়ংয়ের মজবুত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য তুলে ধরার পথ কঠিন করে তুলছে।
গবেষকদের ধারণা, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘায়িত সংঘাত ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুখে ট্রাম্প আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বড় ধরনের কোনো সাফল্য প্রমাণ করতে চাইছেন। অপরদিকে, ট্রাম্পের সঙ্গে নতুন কোনো আলোড়ন সৃষ্টিকারী আলোচনায় অংশ নিয়ে কিমের রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ খুবই সামান্য।
ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোকে সামরিক সহায়তা ও অস্ত্র সরবরাহের বদৌলতে রুশ রাষ্ট্রপ্রধান ভ্লাদিমির পুতিনের কাছ থেকে কৌশলগত সমর্থন পেয়েছেন কিম। এই সহযোগিতা পারমাণবিক পরীক্ষার কারণে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক অবরোধ মোকাবিলায় উত্তর কোরিয়াকে বাড়তি সুবিধা দিচ্ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জুলাই মাসের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতি টানা তৃতীয়বারের মতো ৩ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে মস্কোর সম্প্রসারিত ব্যবসায়িক সহযোগিতাই এই আর্থিক উন্নতির মূল ভিত্তি বলে মনে করে সংস্থাটি।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনও উত্তর কোরিয়ার অন্যতম নিকটতম বন্ধু ও তাদের অর্থনীতি-কূটনীতির বড় শক্তির উৎস। কিউংনাম ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর ফার ইস্টান স্টাডিজের শিক্ষক লিম উল-চুল এএফপি-কে জানান, "আমি এই মুখোমুখি আলোচনার কোনো সুযোগই দেখছি না।" তাঁর মতে, "বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বিদ্যমান রাজনৈতিক সমীকরণ ধরে রাখাই কিম জং উনের জন্য সবচেয়ে লাভজনক কৌশল।" চলতি সপ্তাহে ওয়াশিংটনে নিযুক্ত দক্ষিণ কোরিয়ার দূত কাং কিয়ং-হোয়া জানান, দুই নেতার সম্ভাব্য আলোচনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো অগ্রগতি হয়নি।
পুরোনো সম্পর্ক ও বর্তমান বাস্তবতা
প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প তিনবার কিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। নিজেদের অম্লমধুর সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে একপর্যায়ে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, তারা যেন ‘প্রেমে পড়েছিলেন’। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক সক্ষমতা কমানোর লক্ষ্যে উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠক হলেও বাস্তবিক অর্থে কোনো সমঝোতা অর্জিত হয়নি। এরপরের বছরগুলোতে উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক প্রযুক্তি ও পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং বিনা কোনো শর্তে পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে আলোচনার প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। গত সেপ্টেম্বরে তিনি মত প্রকাশ করেন, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ না করে সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার বিষয়টি নিয়ে ওয়াশিংটনের আলোচনা করা উচিত।
তবে সমালোচকদের মতে, এতে উত্তর কোরিয়াকে কার্যত পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পরোক্ষ স্বীকৃতি দেওয়ার ঝুঁকি থেকে যায় এবং নিজেদের অস্ত্রাগার অক্ষত রেখেও দেশটি আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সুবিধা পেয়ে যেতে পারে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, চীনও হয়তো উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সক্ষমতার বিষয়টিকে নিঃশব্দে মেনে নিচ্ছে। গত জুনে পিয়ংইয়ংয়ে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে স্বাগত জানান কিম। তার অল্প কিছুদিন আগেই শি জিনপিং বেইজিংয়ে ট্রাম্প ও পুতিনের সঙ্গে পৃথক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন। পিয়ংইয়ং বা বেইজিং কোনো পক্ষের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তিতে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কিছু বলা হয়নি, যাকে বিশেষজ্ঞরা চীনের নীরব সম্মতি বলেই মনে করছেন।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং মিন এএফপি-কে বলেন, "একপক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এবং অপরপক্ষে উত্তর কোরিয়া, চীন ও রাশিয়া—এই দুই ধারায় বৈশ্বিক জোটের মেরুকরণ পিয়ংইয়ংয়ের জন্য বড় রকমের ভূ-রাজনৈতিক সুযোগ এনে দিয়েছে।"
পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ প্রশ্নে কঠোর পিয়ংইয়ং
উত্তর কোরিয়া বারবার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র পরিত্যাগ করা নিয়ে আর কোনো টেবিলে বসবে না।
কিম জং উনের প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং গত সেপ্টেম্বরে এক বিবৃতিতে জানান, পারমাণবিক শক্তিধর দেশ হিসেবে উত্তর কোরিয়ার অর্জন চূড়ান্ত ও অপরিবর্তনীয়। যারা এখনো তাদের নিরস্ত্রীকরণের স্বপ্ন দেখে, তাদের তিনি 'নির্বোধ' বলে চিহ্নিত করেন। অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কোরীয় গবেষণা বিভাগের শিক্ষক ভ্লাদিমির তিখোনভ এএফপি-কে বলেন, "উত্তর কোরিয়ার পরমাণু সক্ষমতা বজায় রেখেই ওয়াশিংটন নতুন কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা শুরু করবে কি না—সেটিই এখন দেখার মূল বিষয়।"
তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে এ ধরণের পরিবর্তনের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে।
গবেষকদের একাংশ মনে করেন, পিয়ংইয়ং ও ওয়াশিংটনের মধ্যস্থতায় চীনের প্রভাব অনেকখানি জড়িত। শেনজেনে যদি বেইজিংকে এড়িয়ে ট্রাম্প ও কিম কোনো চুক্তি করেন, তবে এ অঞ্চলে চীনের প্রভাব সংকুচিত হতে পারে। উত্তর কোরিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান ইয়াং মু-জিন বলেন, "পুতিন ও শি জিনপিংয়ের সবুজ সংকেত নিয়েই কেবল যেকোনো সংলাপ সামনের দিকে এগোতে পারে।" তবে রাশিয়ার কাছ থেকে তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পাওয়ায় সময় ও কৌশলগত সুবিধার পাল্লা এখন কিম জং উনের দিকেই ভারী।
ইয়াং আরও যোগ করেন, "বর্তমান সুবিধা হাতছাড়া করে, রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের সমর্থন গুটিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনিশ্চিত কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কে জড়ানো পিয়ংইয়ংয়ের জন্য এখন প্রায় অসম্ভব।"