একটি প্রস্তুতি ম্যাচ, মাত্র ৪৫ মিনিটের খেলা—অথচ সেই ম্যাচই বদলে দিয়েছে এক গোলরক্ষকের আন্তর্জাতিক ফুটবলজীবনের গতিপথ! বেলজিয়ামে জন্ম, সেখানেই বেড়ে ওঠা, দেশের বয়সভিত্তিক দলে ২৬টি ম্যাচ খেলা। কিন্তু জাতীয় দলের মূল একাদশে জায়গা না পেয়ে বাবার দেশ সার্বিয়ার হয়ে মাঠে নেমেছিলেন মিলে সভিলার। তখন কি তিনি জানতেন, সিদ্ধান্তটি তাঁকে এমন এক পরিস্থিতিতে ফেলবে, যেখান থেকে নিজের জন্মভূমির হয়ে খেলার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে? আজ ইউরোপের অন্যতম আলোচিত গোলরক্ষক হয়েও জাতীয় দলের পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তার গল্পে জড়িয়ে আছেন তিনি।
ঘটনাটি ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বরের। হাঙ্গেরির দেব্রেচেন শহরে কাতারের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলতে নামে সার্বিয়া। বিরতির সময় গোলরক্ষক প্রেদ্রাগ রাইকোভিচের পরিবর্তে মাঠে নামেন তখন ২২ বছর বয়সী মিলে সভিলার। সার্বিয়ার জার্সিতে সেটিই ছিল তাঁর অভিষেক। ম্যাচে ৪-০ গোলে জয় পায় সার্বিয়া। কিন্তু সভিলারের জন্য সেই ম্যাচ হয়ে ওঠে আন্তর্জাতিক ফুটবলজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড়। এরপর বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের আরও চারটি ম্যাচের দলে থাকলেও আর মাঠে নামার সুযোগ পাননি তিনি। ফলে সার্বিয়ার হয়ে তাঁর আন্তর্জাতিক ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়ায় মাত্র একটিতে। অথচ পরবর্তী সময়ে ইতালির ক্লাব রোমার হয়ে অসাধারণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন এই গোলরক্ষক। এমনকি ইতালির সর্বোচ্চ ফুটবল প্রতিযোগিতায় সেরা গোলরক্ষকের স্বীকৃতিও পেয়েছেন তিনি।
মিলে সভিলারের ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল পারিবারিক পরিবেশ থেকেই। তাঁর বাবা রাতকো সভিলার ছিলেন সাবেক যুগোস্লাভিয়ার জাতীয় দলের গোলরক্ষক। জাতীয় দলের হয়ে নয়টি ম্যাচ খেলার পাশাপাশি দীর্ঘ ১৬ বছর রয়্যাল অ্যান্টওয়ার্পের গোলবার সামলেছেন তিনি। ১৯৯৯ সালের আগস্টে বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে জন্ম নেওয়া মিলে মাত্র ১০ বছর বয়সে যোগ দেন ব্রাসেলসের আন্ডারলেখটের বয়সভিত্তিক দলে। বেলজিয়ামের অনূর্ধ্ব-১৫ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলেছেন তিনি। ২০১৬ সালের ইউরোপীয় অনূর্ধ্ব-১৭ প্রতিযোগিতায় নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর ২০১৭ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে পর্তুগালের ক্লাব বেনফিকায় যোগ দেন। সেখানেই পেশাদার ফুটবলে তাঁর অভিষেক ঘটে।
কিন্তু বেলজিয়ামের জাতীয় দলে থিবো কোর্তোয়ার মতো প্রতিষ্ঠিত গোলরক্ষক থাকায় সিনিয়র পর্যায়ে সুযোগ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে বাবার দেশ সার্বিয়ার হয়ে খেলার সুযোগ সামনে এলে সেই পথই বেছে নেন সভিলার। সমস্যা শুরু হয় এরপর। সার্বিয়ার গোলরক্ষক বিভাগে প্রেদ্রাগ রাইকোভিচ ও ভানিয়া মিলিঙ্কোভিচ-সাভিচের মতো খেলোয়াড়দের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয় তাঁকে। সুযোগের অপেক্ষায় থাকলেও নিয়মিত খেলার সুযোগ পাননি তিনি। একপর্যায়ে নিজের জন্মভূমি বেলজিয়ামের হয়ে খেলার সম্ভাবনা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন।
কিন্তু সামনে এসে দাঁড়ায় আন্তর্জাতিক ফুটবলের যোগ্যতা পরিবর্তনের নিয়ম। সাধারণভাবে, কোনো খেলোয়াড় নির্দিষ্ট শর্তে জাতীয় দল পরিবর্তনের সুযোগ পেতে পারেন। তবে এক দেশের হয়ে সিনিয়র পর্যায়ে খেলার পর অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে ফিফার নির্ধারিত যোগ্যতার শর্ত পূরণ করতে হয়। সভিলারের ক্ষেত্রে সার্বিয়ার হয়ে খেলা সেই একটি ম্যাচই বেলজিয়ামে ফেরার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২২ সালে বেনফিকা ছেড়ে ইতালিতে আসার পরও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলেছে। ২০২৪ সালে বেলজিয়ামের তৎকালীন কোচ দোমেনিকো তেদেস্কো জানিয়েছিলেন, তাঁরা সভিলারের পারফরম্যান্স পর্যবেক্ষণ করছেন, কিন্তু সে সময়কার নিয়ম অনুযায়ী তাঁকে বেলজিয়ামের হয়ে খেলানো সম্ভব হচ্ছিল না। পরবর্তী সময়েও তাঁর জাতীয় দল পরিবর্তনের চেষ্টা সফল হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এদিকে সার্বিয়ার দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি। ২০২৫ সালে দেশটির কোচ ভেলিয়াকো পাউনোভিচ জানিয়েছিলেন, সভিলারের সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে এবং জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ রয়েছে। তবে সভিলার নিজেই আর সার্বিয়ার হয়ে খেলতে আগ্রহী নন বলে কোচের বক্তব্যে উঠে আসে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, যে গোলরক্ষক ক্লাব ফুটবলে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছেন, তিনি কি কখনো নিজের পছন্দের দেশের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ফিরতে পারবেন? নাকি ২০২১ সালের সেই একটি প্রস্তুতি ম্যাচই তাঁর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ হয়ে থাকবে? মিলে সভিলারের গল্প তাই শুধু একজন গোলরক্ষকের সুযোগ না পাওয়ার কাহিনি নয়। এটি এমন এক সিদ্ধান্তের গল্প, যার প্রভাব দীর্ঘদিন ধরে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাঁকে। ক্লাব ফুটবলে যতই সাফল্য আসুক, জাতীয় দলের হয়ে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন এখনো তাঁর সামনে এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।