রাজধানীতে পুলিশের একজন অতিরিক্ত ডিআইজির বাসভবনে মধ্যরাতে অভিযান চালিয়ে ৮৫ জন তরুণ-তরুণীকে আটক এবং পরবর্তীতে ডিএমপির বিশেষ আদালতে কারও ১৫ দিন, আবার কারও ৩০ দিনের কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনা চরম বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তল্লাশিতে সামান্য পরিমাণ মাদক জব্দ হলেও মূল শাস্তির কারণ হিসেবে উচ্চশব্দে গান বাজিয়ে জনউপদ্রব সৃষ্টির কথা জানিয়েছে পুলিশ। তবে সমগ্র অভিযানের স্বচ্ছতা, কোনো নিয়মিত মামলা না হওয়া এবং সাজা দেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও অপরাধ বিশ্লেষকরা। অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ার পূর্বেই ভিডিও প্রকাশ করায় ক্ষতিগ্রস্তদের আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।
গত সোমবার (২০ অক্টোবর) দিবাগত মধ্যরাতে রাজধানীর ভাটারা থানা এলাকায় পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরের মালিকানাধীন বাসভবনে ঝটিকা অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) উত্তরা বিভাগ। আনুমানিক ৩ ঘণ্টার এই তল্লাশি শেষে ভাড়াকৃত ওই ফ্ল্যাট থেকে মাত্র দুই বোতল মদ, একটি ইয়াবা ট্যাবলেট এবং সামান্য পরিমাণ কুশ উদ্ধার করা হয়।
অভিযানকালে সেখান থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ও সম্প্রতি পড়াশোনা শেষ করা ৮৫ জন তরুণ-তরুণীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে ডিএমপির বিশেষ আদালতের (সামারি ট্রায়াল) মাধ্যমে তরুণীদের ১৫ দিন এবং তরুণদের ৩০ দিন করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়।
ডিবি উত্তরা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) ইলিয়াস কবীর জানান, ডিএমপি আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় তরুণদের এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে অতিরিক্ত ১৫ দিনের সাজা দেওয়া হয়েছে। একইভাবে তরুণীদের ১৫ দিনের কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ৩ দিনের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়।
তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, ওই অতিরিক্ত ডিআইজির বাসভবনের ১০০ মিটারের মধ্যে কোনো নিকটবর্তী বসতি বা আবাসিক ভবন নেই। ফলে 'প্রতিবেশীদের অতিষ্ঠ হওয়ার' পুলিশি দাবির ভিত্তি নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এই অসংগতির বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ডিবির ওই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। মুঠোফোনে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে ভুল বোঝাবুঝি বাড়বে, আমাকে দয়া করে মাফ করবেন।”
এর আগে অবশ্য তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশেই এই ঝটিকা অভিযান পরিচালিত হয়। তিনি জানান, তাঁর কাছে পূর্ব থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ছিল না। স্পটে পৌঁছানোর পরই তাঁকে অভিযান পরিচালনার আদেশ দেওয়া হয়।
এদিকে আইনি বিশেষজ্ঞরা এই সম্পূর্ণ সাজা প্রদান প্রক্রিয়াকে অস্বচ্ছ ও আইন বহির্ভূত বলে অভিহিত করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত জাহান মন্তব্য করেন, সমন বা ভ্রাম্যমাণ আদালত ইচ্ছা করলেই কাউকে তাৎক্ষণিক সাজা দিতে পারেন না। ঘটনার সরাসরি প্রত্যক্ষদর্শীর সামনে অপরাধ সংঘটিত হতে হবে এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজে দোষ স্বীকার করলেই কেবল সাজা দেওয়া যায়। একই সাথে ৮৫ জন তরুণ-তরুণী অপরাধ স্বীকার করেছেন—এমন দাবি একেবারেই অবাস্তব।
সুপ্রিম কোর্টের অপর এক আইনজীবী সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন, গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির ছবি বা ভিডিও গণমাধ্যমে প্রচার না করার বিষয়ে উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। পুলিশ এই পুরো প্রক্রিয়ায় চরম অস্বচ্ছতার পরিচয় দিয়েছে।
একযোগে এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থীকে কারাদণ্ড দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক তৌহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “যে পরিস্থিতিতে তরুণ-তরুণীদের আটক করা হলো, সাজা দেওয়া হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন অজুহাতে। এই শাস্তির কোনো নৈতিক ও আইনি ভিত্তি নেই। নেপথ্যে কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় এই অভিযান চালানো হয়েছে কি না, তা গভীরভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন।”
ঘটনায় কোনো নিয়মিত মামলা না করে সরাসরি বিশেষ আদালতে সাজা দেওয়ার আইনি কৌশল নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা।