ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি আরব থেকে শুরু করে একাধিক দেশের মার্কিন দূতাবাসে কর্মীসংখ্যা কমানো হচ্ছে। কিন্তু এই পদক্ষেপের পেছনে ঠিক কতটা বড় নিরাপত্তাঝুঁকি রয়েছে? আর কেন যুদ্ধের আশঙ্কার মধ্যেই আবারও ঘরবাড়ি ও সন্তানদের স্কুল ছেড়ে চলে যেতে হচ্ছে মার্কিন কূটনীতিকদের পরিবারগুলোকে?
সৌদি আরবে জরুরি দায়িত্বে নিয়োজিত নন, এমন মার্কিন কর্মী এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও লেবাননের মার্কিন কূটনৈতিক মিশনগুলোতেও কর্মীদের উপস্থিতি সমন্বয় করা হচ্ছে। তবে সব দেশে একই ধরনের প্রত্যাহার কার্যক্রম চলছে না। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, কয়েকটি দেশে সীমিত কার্যক্রমের আওতায় কর্মীসংখ্যায় সাময়িক পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ইরানের সম্ভাব্য হামলা এবং মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার পরিচালক জে ক্লেটন ২৩ অক্টোবর পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে সতর্ক করেছেন, মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার ইরানি তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ কয়েকটি দেশে মার্কিন নাগরিকদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা অগ্রসর পর্যায়ে রয়েছে বলেও গোয়েন্দা তথ্যে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। স্মারকলিপিটির বিষয়বস্তু প্রথম প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস।
এদিকে সৌদি আরবে হুথিদের হামলার হুমকিও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আগেই সতর্ক করেছে, হুথিদের হামলার ঝুঁকি তাৎক্ষণিক লক্ষ্যবস্তুর আশপাশের এলাকা ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত হতে পারে। অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনার কথা বলেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, দ্রুত সামরিক পদক্ষেপ নিতে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ দিলেও এখন পর্যন্ত সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। তবে নিরাপত্তার এই সিদ্ধান্ত মার্কিন কূটনীতিকদের পরিবারগুলোর জন্য নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। যুদ্ধের শুরুর দিকে অনেক পরিবার কর্মস্থল ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে তারা ফিরে এসে নতুন বাসস্থান খুঁজেছে, সন্তানদের আবার স্কুলে ভর্তি করিয়েছে এবং স্বাভাবিক জীবনে ফেরার চেষ্টা করেছে। এখন আবারও চলে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
আমেরিকান ফরেন সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের মুখপাত্র নিকি গেমার বলেছেন, চলতি বছরের শুরুর দিকে পরিবারগুলো যে বিশৃঙ্খলার মুখে পড়েছিল, বর্তমান পরিস্থিতি যেন তারই পুনরাবৃত্তি। অনেক পরিবার নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে শুরু করার পর আবারও সরে যাওয়ার নির্দেশ পেয়েছে। এ ছাড়া আর্থিক সহায়তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সংগঠনটির অভিযোগ, কয়েকটি দেশের পরিবারকে আবাসন সহায়তা ও দৈনিক ভাতার বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না দিয়েই চলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। কেউ কেউ দূতাবাসের নেতৃত্বের কাছ থেকে বিস্তারিত নির্দেশনা পাওয়ার আগেই সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে প্রত্যাহারের খবর জেনেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মী ও তাদের পরিবারকে দৈনিক ভাতা এবং বাসস্থান ও স্কুলসংক্রান্ত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দেশের জন্য নির্ধারিত সরকারি হারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়ে কর্মকর্তা বলেন, সাম্প্রতিক পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা হচ্ছে এবং তাদের সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।
সব মিলিয়ে, মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটনের উদ্বেগ বাড়ছে। তবে ইরানের সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা কতটা বাস্তব রূপ নেবে, কিংবা এই কর্মী প্রত্যাহার আরও বিস্তৃত হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। পরিস্থিতির পরবর্তী গতিপথ নির্ভর করছে গোয়েন্দা মূল্যায়ন, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।