ভারতের মহারাষ্ট্রের রাজনীতিতে এবার ৫০০ কোটি রুপির রহস্যময় লেনদেন ঘিরে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে দাবি করা হয়েছে, বিজেপির কাছ থেকে শিবসেনার এক সংসদ সদস্যের মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল এক আন্দোলনকারীর কাছে। কিন্তু সত্যিই কি এই অর্থের লেনদেন হয়েছিল? নাকি এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র? এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করেই মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়েছে ক্ষমতাসীন জোটের দুই শরিক বিজেপি ও শিবসেনা।
বিতর্কের সূত্রপাত মারাঠা সম্প্রদায়ের জন্য সংরক্ষণের দাবিতে আন্দোলনকারী মনোজ জারাঙ্গে পাতিলের প্রকাশ করা একটি অডিও ক্লিপ থেকে। ওই রেকর্ডিংয়ে এক অজ্ঞাতপরিচয় নারীকে দাবি করতে শোনা যায়, বিজেপির কাছ থেকে ৫০০ কোটি রুপি শিবসেনার সংসদ সদস্য শ্রীকান্ত শিন্ডের মাধ্যমে তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। তবে এই অর্থ আদৌ লেনদেন হয়েছে কি না, হয়ে থাকলে তা কোথায় গেছে—এসব প্রশ্নের কোনো নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। মনোজ জারাঙ্গে পাতিল অবশ্য তাঁর বিরুদ্ধে ৫০০ কোটি রুপি চাওয়া বা পাওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, অডিও ক্লিপটি আসল। তবে রেকর্ডিংয়ে যাঁদের কথা শোনা যাচ্ছে, তাঁদের পরিচয় এবং কথোপকথনের প্রকৃত প্রেক্ষাপট সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। ফলে অডিওটির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন শ্রীকান্ত শিন্ডে। তিনি মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডের ছেলে। তাঁর মাধ্যমে অর্থ পৌঁছানোর অভিযোগ সামনে আসতেই শিবসেনার নেতারা বিষয়টিকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। একইভাবে বিজেপির নেতারাও তাঁদের দলের সঙ্গে এই কথিত অর্থ লেনদেনের যোগসূত্র টানার অভিযোগের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। শিবসেনার নেতা ও সাবেক মন্ত্রী রামদাস কদম অভিযোগ করেছেন, বিজেপির একটি অংশ একনাথ শিন্ডেকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে তিনি বিজেপির বিধান পরিষদ সদস্য প্রবীণ দারেকর ও প্রসাদ লাডের নাম উল্লেখ করেন। এমনকি প্রসাদ লাড ও মনোজ জারাঙ্গে পাতিলকে একসঙ্গে দেখা যাচ্ছে—এমন একটি ছবিও সামনে আনেন তিনি।
তবে এসব অভিযোগের পাল্টা জবাব দিয়েছেন বিজেপি নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, প্রমাণ ছাড়া এভাবে বিজেপিকে অভিযুক্ত করা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রসাদ লাড দাবি করেছেন, মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশের বিরুদ্ধে জারাঙ্গে পাতিলকে নেপথ্য থেকে কারা সমর্থন দিয়েছেন, তা শিগগিরই প্রকাশ্যে আসবে। পাশাপাশি বিজেপি এ ঘটনার যথাযথ জবাব দেবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। অন্যদিকে, একনাথ শিন্ডে সরাসরি অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। দিল্লিতে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, তিনি ৫০০ কোটি রুপি দেননি, আবার নেনওনি। তাঁর মতে, কোনো অভিযোগ তোলার আগে সেটি যাচাই করা প্রয়োজন। জারাঙ্গে পাতিলের কাছে প্রমাণ থাকলে তা তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া উচিত।
পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিশ। শিবসেনার একটি প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে দেখা করার পর অডিও ক্লিপটির ফরেনসিক পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফড়নবিশ প্রশ্ন তুলেছেন, আড়াই বছর পর এখন কেন এই কথোপকথন সামনে আনা হচ্ছে। এদিকে, শ্রীকান্ত শিন্ডে বিষয়টি নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ৫০০ কোটি রুপি নগদ দেখতে কেমন এবং তা পরিবহনের জন্য কতগুলো গাড়ি প্রয়োজন—তা নিয়েই তাঁরা আলোচনা করছিলেন। পরে বিজেপি নেতা প্রসাদ লাড দাবি করেন, দুই দলের নেতাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং বিরোধ মিটে গেছে। তিনি বিজেপি ও শিবসেনার মধ্যে বিভেদ তৈরির চেষ্টার জন্য বিরোধী শিবিরের নেতা সঞ্জয় রাউতকে দায়ী করেন।
তবে বিরোধ মিটে যাওয়ার দাবি উঠলেও ৫০০ কোটি রুপির কথিত লেনদেন নিয়ে মূল প্রশ্নগুলোর উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। অডিওটির ফরেনসিক পরীক্ষায় কী উঠে আসে, অর্থের লেনদেনের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না এবং এই বিতর্কের পেছনে প্রকৃত ঘটনা কী—সেদিকেই এখন নজর মহারাষ্ট্রের রাজনৈতিক মহলের।