কুড়িগ্রামের উলিপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গড়ে ওঠা প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে সালিশ বৈঠক, অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা এবং তার পরদিনই এক নারীর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। নাজমা খাতুন নামের ৪৪ বছর বয়সী ওই নারীর মৃত্যুকে ঘিরে স্থানীয় কয়েকজন বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি আরও স্পষ্ট হতে পারে।
ঘটনাটি ঘটেছে উলিপুর উপজেলার ধামশ্রেনী ইউনিয়নের পশ্চিম নাওড়া এলাকায়। গত রবিবার দুপুরে বাড়ির গোয়ালঘরের আড়ার সঙ্গে ওড়না পেঁচানো অবস্থায় নাজমার মরদেহ দেখতে পান তাঁর স্বজনেরা। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে। সোমবার ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠানো হয়। পরিবার ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ছয় মাস আগে ফেসবুকের মাধ্যমে সাইদুর রহমান পলাশ নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে নাজমার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাঁদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওই ব্যক্তি নিজেকে রেল পুলিশের সদস্য পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে নাজমার কাছ থেকে স্বর্ণালংকার ও ৩০ হাজার টাকা নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ওই ব্যক্তি নাজমার সঙ্গে দেখা করতে পশ্চিম নাওড়া এলাকায় গেলে স্থানীয়দের সন্দেহ হয়। পরে দুজনকে আটকে রাখা হয়। স্থানীয়দের দাবি, ওই রাতেই তাঁদের সম্মতিতে বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু বিয়ের নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র চাইলে ওই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে সন্দেহ দেখা দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্য, পলাশ নামে পরিচয় দেওয়া ব্যক্তির প্রকৃত নাম দুলাল চন্দ্র। তাঁর বয়স ৫৩ বছর এবং বাড়ি উপজেলার পান্ডুল ইউনিয়নের খোঁচাবাড়ি এলাকায়। পরিচয় নিয়ে সন্দেহ দেখা দেওয়ার পর বিয়ের আয়োজন বন্ধ হয়ে যায় এবং তাঁকে রাতভর আটকে রাখা হয়।
এরপর গত শনিবার রাতে উলিপুর পৌর শহরের একটি স্থানে সালিশ বৈঠক বসে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। বৈঠকে ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সফি কামাল এবং পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলসহ কয়েকজন উপস্থিত ছিলেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যাঁরা দুলাল চন্দ্রকে আটকে রেখেছিলেন, তাঁদের না জানিয়েই অর্থের বিনিময়ে বিষয়টির সমঝোতা করা হয় এবং তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁদের দাবি, প্রেমের সম্পর্ক ও বিয়ের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিকভাবে অপমানিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় নাজমা মানসিক চাপে ছিলেন। তবে এই পরিস্থিতির সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
সালিশ বৈঠকে উপস্থিত থাকার কথা স্বীকার করেছেন ধামশ্রেনী ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সহিদুল ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ায় দুই পক্ষের স্বজনদের নিয়ে সমঝোতা করা হয়েছিল। তিনি দাবি করেন, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয় এবং উপস্থিত সবার সামনে সেই অর্থ নাজমার স্বজনদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে পান্ডুল ইউনিয়ন বিএনপির সদস্যসচিব জিয়াউল হক বাদলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। উলিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শওকত আলী সরকার জানিয়েছেন, নাজমার মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য কুড়িগ্রাম মর্গে পাঠানো হয়েছে। তাঁর ভাই একটি অপমৃত্যুর মামলা করেছেন। এখন তদন্তের মাধ্যমে নাজমার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, সালিশে কী ঘটেছিল এবং অর্থের বিনিময়ে সমঝোতার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও পুলিশের তদন্তের ফলাফলই এ ঘটনায় পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।