জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি এবার নতুন অর্থনৈতিক মোড় নিতে যাচ্ছে? একদিকে এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগ, অন্যদিকে দ্রুতগতির

জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ৩:৪৭ সময় , আপডেট সময় : ২৭ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ৩:৪৭ সময়

জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কি এবার নতুন অর্থনৈতিক মোড় নিতে যাচ্ছে? একদিকে এক ট্রিলিয়ন ইয়েনের বিনিয়োগ, অন্যদিকে দ্রুতগতির রেল, জ্বালানি অবকাঠামো ও আধুনিক প্রযুক্তিতে সহযোগিতার পরিকল্পনা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মহাকাশ গবেষণা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জাপানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন কিছু প্রস্তাব তুলে ধরেছেন, যা বাস্তবায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও অবকাঠামো উন্নয়নে বড় পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।


মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর, স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ১১টায় জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় কান্তেইতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার করার পাশাপাশি জ্বালানি নিরাপত্তা, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়।


বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, শিল্পায়ন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে জাপানের সরকার এবং বেসরকারি খাতকে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি ও উৎপাদনশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করতে তাঁর সরকার কাজ করছে। তাঁর প্রত্যাশা, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে। আর ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।


বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকেই জাপান গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন। তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় জ্বালানি নিরাপত্তা। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। এ ক্ষেত্রে জাপানের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি। এশিয়ায় জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগের আওতায় জাপানের ৫০ বিলিয়ন ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণের বিষয়টিও আলোচনায় আসে।


প্রযুক্তি খাতেও রয়েছে বড় পরিকল্পনা। বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। এর মাধ্যমে জাপানের কোম্পানি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা এবং দক্ষ প্রযুক্তিকর্মীদের সংযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি মহাকাশ গবেষণা, উপগ্রহ প্রকৌশল ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তিতে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে সহযোগিতা সম্প্রসারণের আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।


যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নেও জাপানের সহযোগিতা চেয়েছে বাংলাদেশ। দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশজুড়ে উড়াল সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। এসব প্রকল্পের পরিকল্পনা, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া জ্বালানি, অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েনের বেসরকারি বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়েও কথা হয় দুই পক্ষের মধ্যে। এ বিনিয়োগ বাস্তবায়নের অগ্রগতি ত্বরান্বিত করতে দ্রুত জাপানি দল পাঠানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে করনীতি, শুল্ক ছাড়করণ, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন তারেক রহমান। পাশাপাশি বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার প্রত্যাশা জানান তিনি।


বৈঠকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ও গুরুত্ব পায়। জাতিসংঘ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের স্থিতিশীলতা এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন দুই দেশের নেতারা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হওয়ায় জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারেক রহমান। রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে রাখাইনে শান্তি প্রতিষ্ঠা, সহিংসতা বন্ধ এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছাতে জাপানের সক্রিয় ভূমিকা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।


বৈঠকের শেষে অগ্রাধিকারভিত্তিক খাতগুলোতে সহযোগিতা বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করতে মন্ত্রীপর্যায়ের যৌথ কমিশন গঠনের প্রস্তাব দেন প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং পারস্পরিক সুবিধার ভিত্তিতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। পাশাপাশি জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান তারেক রহমান। সব মিলিয়ে, এই শীর্ষ বৈঠকে শুধু বন্ধুত্বের সম্পর্ক নয়, বরং বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও যোগাযোগ অবকাঠামো ঘিরে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি বিস্তৃত রূপরেখা সামনে এসেছে। এখন বড় প্রশ্ন, আলোচনায় উঠে আসা এসব প্রস্তাব কত দ্রুত বাস্তব প্রকল্পে রূপ নেয় এবং তার সুফল বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও অর্থনীতিতে কতটা পৌঁছায়।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯