নিজের সামান্য রাষ্ট্রীয় সম্মানও মেনে নিতে পারছে না জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি—এমন অভিযোগ তুলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন আমজনতার দলের সদস্যসচিব তারেক রহমান। তাঁকে হেয় করতে গিয়ে দল দুটি তাঁর রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়াও সহ্য করতে পারছে না বলে দাবি করেছেন তিনি। মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ বক্তব্যে নিজের রাজনৈতিক সংগ্রাম, দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা, আটক ও রিমান্ডের ঘটনা এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরেন এই নেতা। একই সঙ্গে জামায়াত ও এনসিপির বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগও আনেন তিনি।
মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া ওই বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে একটি অনুষ্ঠানে যাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তাঁকে সঙ্গে নিয়ে আবারও কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার কথা মজা করে বলেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, বিরোধীরা সমালোচনা করলেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে থাকবেন। নিজের রাজনৈতিক জীবনের কঠিন সময়ের কথাও তুলে ধরেন আমজনতার দলের এই নেতা। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাতে গিয়ে একসময় শুভাকাঙ্ক্ষী ও প্রবাসীদের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়েছে তাঁকে। সেই অর্থ দিয়ে খাবার, বাসাভাড়া ও যাতায়াতের খরচ মেটাতেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে নিজের উপার্জনে চলার চেষ্টা করেছেন বলেও জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, পারিবারিকভাবে রাজনীতিতে আগ্রহ ও সমর্থন না থাকায় তাঁকে নানা আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ফল ও মধুর ব্যবসাও করেছেন তিনি। নিজের জীবিকার ব্যবস্থা করতে গিয়ে এসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে বলে জানান এই রাজনীতিক।
রাজনৈতিক আন্দোলনে নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তারেক রহমান দাবি করেন, ২০১৮ সালের বিভিন্ন আন্দোলন, মোদিবিরোধী কর্মসূচি এবং ভারতীয় পণ্য বর্জনের প্রচারণায় ব্যবহৃত কিছু লিফলেট তৈরিতে তাঁর ভূমিকা ছিল। একই সঙ্গে নিজের জীবনে একাধিকবার আটক, গুম ও রিমান্ডে থাকার অভিজ্ঞতার কথাও বর্ণনা করেন তিনি। এসব ঘটনা সম্পর্কে তাঁর দেওয়া বিবরণে ২০১৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের কথা উঠে এসেছে। জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে বিরোধের বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তারেক রহমান বলেন, তিনি এই বিরোধকে কেবল রাজনৈতিক মতপার্থক্য হিসেবে দেখেন না; বরং তাঁর ভাষায়, এটি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত।
মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কথা বলার বিরোধিতা করা হয়েছে। এর বিপরীতে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম হিসেবে বর্ণনা করেন তিনি। এ ছাড়া জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ নিয়ে বক্তব্যে কয়েকটি অভিযোগ তোলেন তারেক রহমান। ১৯৭১ সালে পরাজিত শক্তির ক্ষমতায় যাওয়ার চেষ্টা এবং ভারতের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়েও দাবি করেন তিনি। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে বক্তব্যে উত্থাপিত দাবির বাইরে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো প্রমাণ উল্লেখ করা হয়নি।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ আট মাসও পূর্ণ হয়নি উল্লেখ করে ক্ষমতা নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের তৎপরতার সমালোচনা করেন তিনি। বিএনপিতে কারও পদায়ন নিয়ে জামায়াত সন্তুষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়ে আরও খোঁজখবর নেওয়ার আহ্বানও জানান আমজনতার দলের সদস্যসচিব। নিজের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগে বিচলিত নন জানিয়ে তারেক রহমান জুলাই-সংক্রান্ত মামলায় কারাগারে থাকা কোনো বীর মুক্তিযোদ্ধাকে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি সম্মান দেখিয়ে জামিন দেওয়ার জন্য আদালতের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর মতে, জামিনে মুক্ত থাকার পর কেউ দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব। এ ধরনের উদ্যোগ জুলাই আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মধ্যকার দূরত্ব কমাতে সহায়ক হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
বক্তব্যের শেষাংশে বাংলাদেশপন্থি, জাতীয়তাবাদী ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সহযোদ্ধাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তাঁকে সঙ্গে রাখার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। সব মিলিয়ে তারেক রহমানের এই বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় সম্মান, রাজনৈতিক বিরোধ, ব্যক্তিগত সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ—একাধিক বিষয় উঠে এসেছে। তাঁর বক্তব্য ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা তৈরি হলেও, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দলগুলোর বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।