যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের চাপ—কোনো কিছুই যেন ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে

মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে ইরানের গোপন সামরিক নেটওয়ার্ক

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:১৪ সময় , আপডেট সময় : ৩১ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর ১০:১৪ সময়

যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং যুদ্ধের চাপ—কোনো কিছুই যেন ইরানের সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে পারেনি। বরং বিদেশি কোম্পানি, ভুয়া ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মধ্যস্থতাকারীদের ব্যবহার করে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল এক গোপন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে হাজার হাজার প্রতিষ্ঠানের আড়ালে সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক তৈরির উপকরণ এবং ভারী যানবাহন আমদানি করছে দেশটি। প্রশ্ন উঠেছে, এত নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও কীভাবে অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠন করছে ইরান?


এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ৫ হাজারেরও বেশি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই গোপন নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে অন্তত ২০০ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী ট্রাক আমদানি করেছে ইরান। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ২৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধে ইরান বিপুলসংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করেছে। যুদ্ধের মধ্যে এত অস্ত্র ব্যবহারের পরও কীভাবে দেশটি নিজেদের অস্ত্রভান্ডার আবার পূরণ করছে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে সামনে এসেছে এই গোপন আমদানি ব্যবস্থার তথ্য।


অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নেটওয়ার্কের অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামের শুরুতে রয়েছে ‘এমওডি’। এসব প্রতিষ্ঠানের ঠিকানা হিসেবে তেহরানে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। কাগজপত্রে অনেক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাকাল দেখানো হয়েছে ১৯৭৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি। অথচ ব্যবসায়িক নথি বলছে, অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই প্রকৃতপক্ষে ২০১৩ সালে গড়ে উঠেছে। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর যোগসূত্র রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিদেশি কোম্পানি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেল বিক্রির অর্থ ব্যবহার করে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।


সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, পর্যালোচনা করা আমদানি চালানের ৯৭ শতাংশের মূল্য পরিশোধে সরাসরি অর্থ লেনদেনের প্রয়োজন হয়নি। অর্থাৎ, আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রচলিত পদ্ধতি এড়িয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় এসব বাণিজ্য সম্পন্ন হয়েছে। ফলে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার নজরদারি এড়িয়ে আমদানি চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এই নেটওয়ার্কের অন্যতম বড় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান এমওডি ৩৪৬৪২৮। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি বিপুল পরিমাণ সামরিক সরঞ্জাম ও সংশ্লিষ্ট উপকরণ সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রকেটের জ্বালানি তৈরির রাসায়নিক পদার্থ, বিস্ফোরক এবং অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ।


২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে চীন থেকে ৮৮৬ টন রাসায়নিক পদার্থ আমদানি করে প্রতিষ্ঠানটি। এসব উপাদানের মধ্যে ছিল সোডিয়াম ক্লোরেট ও পারক্লোরেট, যা কঠিন জ্বালানিচালিত রকেট তৈরিতে ব্যবহার করা যায়। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এসব রাসায়নিকের একটি চালানের সঙ্গে ২০২৫ সালের ২৬ এপ্রিল ইরানের শহিদ রাজায়ি বন্দরের ভয়াবহ বিস্ফোরণের যোগসূত্র রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে। ওই বিস্ফোরণে অন্তত ৭০ জন নিহত এবং ১ হাজার ২০০ জনের বেশি আহত হন।


শুধু রাসায়নিক নয়, সামরিক কাজে ব্যবহারযোগ্য যানবাহনও আমদানি করেছে ইরান। এর মধ্যে রয়েছে ৪৩৫টি আইভেকো ট্রাক। এসব ভারী ট্রাককে পরিবর্তন করে ভ্রাম্যমাণ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণযান হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব। পাশাপাশি হাজার হাজার টয়োটা হাইলাক্স ও ল্যান্ড ক্রুজার পিকআপও আমদানি করা হয়েছে, যেগুলোতে ভারী মেশিনগান বসিয়ে সামরিক কাজে ব্যবহার করতে পারে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও আমদানি বন্ধ করেনি তেহরান। চীন থেকে ৯৩ টন টাইটানিয়াম, ২৬৮ টন নাইট্রোসেলুলোজ এবং আরও ২৭৬ টন রাসায়নিক পদার্থ সংগ্রহ করেছে দেশটি। এসব উপাদান ক্ষেপণাস্ত্রের কাঠামো, রকেটের জ্বালানি ও বিস্ফোরক তৈরিতে ব্যবহার করা যায়।


অন্যদিকে, রাশিয়া থেকে পাঁচটি চালানে ৭৬ লাখ ডলারের বিস্ফোরক সক্রিয় করার যন্ত্র আমদানি করেছে ইরান। সর্বশেষ চালানটি পৌঁছেছে জুন মাসে। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকেও প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য আমদানি করেছে দেশটি। সব মিলিয়ে এই অনুসন্ধান ইঙ্গিত দিচ্ছে, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও সামরিক উৎপাদনের প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহের বিকল্প ব্যবস্থা ধরে রেখেছে ইরান। এখন বড় প্রশ্ন, যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও দেশটির এই গোপন সরবরাহব্যবস্থা কতদিন সচল থাকবে? আর ইরানের অস্ত্রভান্ডার পুনর্গঠনের এই প্রচেষ্টা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতকে আরও কতটা জটিল করে তুলবে?

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯