১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। নিজের বাসভবন থেকে পাশের কার্যালয়ের

নিজেরই দুই দেহরক্ষীর একের পর এক গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ইন্দিরা গান্ধী

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ১ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:১২ সময় , আপডেট সময় : ১ নভেম্বর ২০২৬, দুপুর ১০:১২ সময়

১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর। ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য দিনের মতোই। নিজের বাসভবন থেকে পাশের কার্যালয়ের দিকে যাচ্ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। কিন্তু তিনি জানতেন না, কয়েক মুহূর্ত পরই নিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই দেহরক্ষীর গুলিতে শেষ হয়ে যাবে তার জীবন। যে মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে ভারত শাসন করেছেন, যার সিদ্ধান্তে বদলে গিয়েছিল দেশটির রাজনীতির গতিপথ, সেই নেত্রীর জীবনের শেষ মুহূর্ত তৈরি হয়েছিল নিজেরই নিরাপত্তাবেষ্টনীর ভেতরে। কিন্তু কেন নিজের দেহরক্ষীরাই তাকে হত্যা করেছিল? এর পেছনে কী ছিল সেই বিতর্কিত সামরিক অভিযানের যোগসূত্র?


১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর সকালে দিল্লির এক সফদরজং রোডের বাসভবন থেকে কার্যালয়ে যাওয়ার পথে ইন্দিরা গান্ধীর ওপর হামলা চালান তার দুই শিখ দেহরক্ষী বিয়ন্ত সিং ও সতবন্ত সিং। প্রথমে বিয়ন্ত সিং খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালান। এরপর সতবন্ত সিং তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে একের পর এক গুলি ছোড়েন। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে দ্রুত দিল্লির সর্বভারতীয় চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা জীবন বাঁচাতে প্রায় চার ঘণ্টা ধরে অস্ত্রোপচার করেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দুপুর ২টা ২৩ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন ইন্দিরা গান্ধী।


চিকিৎসক পি বেণুগোপালের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, হামলায় তার শরীরে বহু গুলি বিদ্ধ হয়েছিল। দীর্ঘ চিকিৎসার পরও তাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। মায়ের মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে হাসপাতালে ছুটে আসেন ছেলে রাজীব গান্ধী। মায়ের নিথর দেহের সামনে দাঁড়িয়ে শোক সামলানো তার জন্য ছিল এক অসহনীয় মুহূর্ত। তবে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিল কয়েক মাস আগের একটি রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযান। যার নাম ছিল অপারেশন ব্লু স্টার।


১৯৮৪ সালের জুনে ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসরে শিখদের পবিত্র উপাসনালয় স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সে সময় জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে ও তার অনুসারীরা স্বর্ণমন্দির এলাকায় শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছিলেন। তাদের লক্ষ্য ছিল খালিস্তান নামে পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ইন্দিরা গান্ধী সামরিক অভিযানের সিদ্ধান্ত নেন। অভিযানে বহু মানুষ হতাহত হন এবং স্বর্ণমন্দিরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এতে ৮৩ জন ভারতীয় সেনা নিহত হন। পাশাপাশি ৪৯২ জন শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর কথা জানানো হয়। তবে বিভিন্ন সূত্রে হতাহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করা হয়েছে।


এই অভিযানের পর শিখ সম্প্রদায়ের একটি অংশের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী ও তার সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক করে। এমনকি তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা শিখ দেহরক্ষীদের সরিয়ে দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছিল। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধী সেই সুপারিশ প্রত্যাখ্যান করেন। তার যুক্তি ছিল, ধর্মের পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে নিরাপত্তার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।


হত্যাকাণ্ডের মাত্র এক দিন আগে, ৩০ অক্টোবর ওডিশার রাজধানী ভুবনেশ্বরে এক জনসভায় দেওয়া বক্তব্যেও নিজের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। বলেছিলেন, তিনি বেঁচে থাকুন বা না থাকুন, তার জীবনের শেষ রক্তবিন্দুও দেশের কাজে লাগবে। কিন্তু পরদিনই সেই কথাগুলো যেন বাস্তবে পরিণত হয়। নিজের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দুই ব্যক্তির গুলিতে শেষ হয়ে যায় তার জীবন। ইন্দিরা গান্ধী ভারতের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী ও আলোচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তার শাসনামলে যেমন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এসেছে, তেমনি বিতর্কিত সিদ্ধান্তের কারণে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে। ৩১ অক্টোবরের সেই হত্যাকাণ্ড শুধু একজন প্রধানমন্ত্রীর জীবনই কেড়ে নেয়নি, বরং ভারতের রাজনীতি ও সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। চার দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও ইন্দিরা গান্ধীর জীবন, শাসন, স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযান এবং তার হত্যাকাণ্ড ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯