‘মায়ের আঁচলেই সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়’—কথাটির যেন বাস্তব প্রতিচ্ছবি দেখা গেল গাজীপুরের কালিয়াকৈরে। চারদিকে শ্রমিক আন্দোলন, সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপ আর উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি। এর মধ্যেই নিজের ছোট্ট সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিরাপদ স্থানের উদ্দেশে ছুটছেন এক মা। এক হাতে সন্তানকে আগলে রেখে অন্য হাতে ধরে রেখেছেন স্কুলব্যাগ। ব্যস্ত মহাসড়কের এই দৃশ্য মুহূর্তেই ছুঁয়ে গেছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়।
সোমবার (২ নভেম্বর) দুপুরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে ধারণ করা মা ও সন্তানের এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই নেটিজেনদের মধ্যে ব্যাপক আবেগ ও আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দিন ধরে ন্যূনতম ৩০ হাজার টাকা মজুরির দাবিতে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন চলছে। কালিয়াকৈরের চন্দ্রা, পল্লী বিদ্যুৎ ও আশপাশের এলাকায় এ আন্দোলনকে ঘিরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও সড়ক অবরোধ, কোথাও বিক্ষোভ, আবার কোথাও শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এমন অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই স্কুল থেকে সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন ওই নারী। হঠাৎ সংঘাতপূর্ণ পরিবেশের মুখে পড়ে সন্তানকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন তিনি। একদিকে শ্রমিকদের বিক্ষোভ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ, অন্যদিকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান—সবকিছুর মধ্যেই সন্তানকে বুকে আগলে দ্রুত সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন মা।
ছবিতে দেখা যায়, শিশুটি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে রয়েছে। মা এক হাতে সন্তানের মাথা ঢেকে রেখেছেন, যেন বাইরের কোনো আঘাত বা বিপদ তার ছোট্ট শিশুটিকে স্পর্শ করতে না পারে। মায়ের পরনে কমলা-লাল শাড়ি এবং পিঠে বেগুনি রঙের স্কুলব্যাগ। চারপাশের অস্থিরতার মাঝেও মা ও সন্তানের এই দৃশ্য ফুটিয়ে তুলেছে নিখাদ ভালোবাসা ও মমত্ববোধের এক অনন্য চিত্র। সেই মুহূর্তে শিশুটির কাছে মায়ের বুকই ছিল সবচেয়ে নির্ভরতার জায়গা। আর মায়ের কাছে সবকিছুর ঊর্ধ্বে ছিল সন্তানের নিরাপত্তা। চারদিকে কী ঘটছে, কোথায় সংঘর্ষ হচ্ছে কিংবা কারা ইটপাটকেল ছুড়ছে—এসবের চেয়ে সন্তানকে নিরাপদে ঘরে পৌঁছে দেওয়াই ছিল তার একমাত্র লক্ষ্য।
মাতৃত্বের ভালোবাসা এমনই। সন্তানের বিপদে মা নিজের ভয়, কষ্ট ও ক্লান্তিকে উপেক্ষা করে তাকে রক্ষার চেষ্টা করেন। প্রতিকূল পরিবেশ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা নানা সংকটের মধ্যেও সন্তানের জন্য নিরাপদ আশ্রয় হয়ে ওঠেন তিনি। কালিয়াকৈরের এই ছবিটি যেন মায়ের সেই চিরন্তন আত্মত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথাই নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। তবে ছবিটির তাৎপর্য কেবল আবেগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি সংঘাত ও সহিংসতার কারণে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের বিষয়টিও সামনে এনেছে। যেকোনো আন্দোলন বা বিক্ষোভের প্রভাব পড়ে পথচারী, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ ও সাধারণ যাত্রীদের ওপরও। বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়।
শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরির দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা, বিশৃঙ্খলা ও জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হওয়া থেকেও বিরত থাকা জরুরি। শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। হয়তো ওই মা কখনো ভাবেননি, সন্তানের নিরাপত্তায় তার এমন ছুটে চলার দৃশ্য হাজারো মানুষের আবেগের কারণ হয়ে উঠবে। ছবিটি তোলার সময় তার মনে ছিল না সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ভাইরাল হওয়ার কোনো চিন্তা। তার কাছে তখন সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল সন্তানকে নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরে যাওয়া।
চারপাশের পৃথিবী যখন অনিশ্চয়তা ও আতঙ্কে ভরে ওঠে, তখন একটি শিশুর কাছে মায়ের কোলই হয়ে ওঠে সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। কালিয়াকৈরের এই দৃশ্য আবারও মনে করিয়ে দিল—মায়ের ভালোবাসা ও সন্তানের প্রতি তার দায়িত্ববোধের কোনো বিকল্প নেই।