খাদ্য মানুষের বেঁচে থাকার অন্যতম মৌলিক অধিকার। অথচ আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগেও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ পর্যাপ্ত খাবার এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি থেকে বঞ্চিত। একদিকে মানুষ ক্ষুধা ও অপুষ্টিতে ভুগছে, অন্যদিকে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হচ্ছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও সবার জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে রয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ২০২৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে আনুমানিক ৬৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ ক্ষুধার মুখে ছিল। যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রায় ২১০ কোটি মানুষ মাঝারি থেকে গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। অর্থাৎ, বিশ্বের বিপুলসংখ্যক মানুষের নিয়মিত পর্যাপ্ত ও নিরাপদ খাবার পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। শুধু খাবারের অভাবই নয়, স্বাস্থ্যকর খাবারের উচ্চমূল্যও বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংস্থাটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বের প্রায় ২৭০ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য হারিয়েছে। ফলে খাদ্যসংকট মোকাবিলায় শুধু কৃষি উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, খাবারকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও আনতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় কৃষি ও খাদ্যব্যবস্থায় নতুন প্রযুক্তি এবং কার্যকর পদ্ধতির ব্যবহার জরুরি। উন্নত বীজ, সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, মাটির স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ফসলের রোগ শনাক্তকরণ এবং ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা কৃষি উৎপাদন ও বিপণনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এসব প্রযুক্তির সুবিধা যেন ক্ষুদ্র কৃষকরাও পান, সেটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি পুষ্টির বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার ২০২৫ সালের যৌথ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ১৫ কোটি ২০ লাখ শিশু খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগেছে। যদিও শিশুদের শুধু মায়ের দুধ পান করার হার ২০১২ সালের ৩৭ শতাংশ থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে ৪৭ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে, তবুও শিশুপুষ্টি নিশ্চিত করতে আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের মতো দেশে চালের পাশাপাশি ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফলমূলের সহজলভ্যতা বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে খাদ্য সংরক্ষণের উন্নত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। কারণ সংরক্ষণের অভাবে অনেক কৃষক ফসল তোলার পরপরই কম দামে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন। ছোট হিমাগার, সৌরশক্তিচালিত শীতলীকরণ ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের বিকাশ ঘটলে খাদ্যের অপচয় কমানো সম্ভব।
এ ছাড়া ডিজিটাল বাজারব্যবস্থা, খাদ্যের নিরাপত্তা যাচাই এবং কৃষক-ক্রেতার সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন। খাদ্য উৎপাদন ও বিপণনে নারী এবং তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাধা ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির মতো সংকট মোকাবিলায় দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে হবে। সব মিলিয়ে, ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব গড়তে শুধু খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিরাপদ খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন, পুষ্টিকর খাবারের সাশ্রয়ী মূল্য, উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কৃষিতে অন্তর্ভুক্তিমূলক উদ্ভাবন। তাহলেই সবার জন্য পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথ সহজ হবে।