নেত্রকোনার খালিয়াজুরীতে বোরো ধান রক্ষায় আবারও শুরু হতে যাচ্ছে হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার কার্যক্রম। কিন্তু বাঁধ নির্মাণ করলেও বিপদ, আবার নির্মাণ না করলেও বিপদ—এমন দুই ধরনের সংকটে পড়েছেন হাওরের কৃষকেরা। কারণ, অপরিকল্পিতভাবে বাঁধ নির্মাণ করলে বৃষ্টির পানি বের হতে পারে না। এতে সৃষ্টি হয় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা। অন্যদিকে বাঁধ না থাকলে আগাম বন্যায় তলিয়ে যেতে পারে হাজার হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল।
কৃষকদের আশঙ্কা, গত বছরের মতো এবারও পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে বাঁধ নির্মাণ করা হলে বড় ধরনের ফসলহানির আশঙ্কা রয়েছে। তাই শুধু বন্যা ঠেকানো নয়, হাওরের জমিতে জমে থাকা পানি দ্রুত বের করার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ৩১ অক্টোবরের মধ্যে বাঁধ নির্মাণের প্রকল্প নির্ধারণ, ৩০ নভেম্বরের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন, ১৫ ডিসেম্বর কাজ শুরু এবং আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে নির্মাণ ও সংস্কারকাজ শেষ করার সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে গত বছরের অভিজ্ঞতা এবারও কৃষকদের উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। গত বোরো মৌসুমে খালিয়াজুরীতে প্রায় ২০ কোটি ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৪৩টি প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ৯১ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ ও সংস্কার করা হয়েছিল। কিন্তু এসব বাঁধে পর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় বৃষ্টির পানি জমে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এর ফলে উপজেলার ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর বোরো জমির প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা। ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম প্রধান কারণ ছিল জমিতে জমে থাকা পানি সময়মতো বের করতে না পারা।
কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক কয়েস আজাদ বলেন, আগাম বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় বাঁধ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু বাঁধের ভেতরে পানি আটকে থাকলে সেই বাঁধই কৃষকদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শুধু পুরোনো বাঁধে মাটি ফেলে সংস্কারের নামে অর্থ ব্যয় না করে পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অলিদুজ্জামান জানিয়েছেন, বাঁধের ভেতরে যাতে জলাবদ্ধতা তৈরি না হয়, সে জন্য পানি নিষ্কাশনের কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে।
অন্যদিকে নেত্রকোনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, কোথায় নতুন স্লুইসগেট প্রয়োজন এবং কোথায় পুরোনো স্লুইসগেট সংস্কার করতে হবে, তা চলতি শুষ্ক মৌসুমে সমীক্ষা করা হবে। তবে এবার নতুন স্লুইসগেট নির্মাণ না করেই বাঁধ সংস্কারের পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেনের তথ্য অনুযায়ী, খালিয়াজুরীতে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়। অনুকূল আবহাওয়া থাকলে বছরে এখানে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন ধান উৎপাদিত হয়। কিন্তু আগে নির্মিত ১৮টি স্লুইসগেটের অধিকাংশই বর্তমানে অকেজো অবস্থায় রয়েছে।
এ অবস্থায় কৃষকদের দাবি, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা সচল না করলে শুধু বাঁধ নির্মাণ করে হাওরের ফসল রক্ষা সম্ভব হবে না। কারণ, একদিকে আগাম বন্যার আশঙ্কা, অন্যদিকে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা—দুই দিক থেকেই বিপদের মুখে রয়েছেন তাঁরা। সব মিলিয়ে খালিয়াজুরীর কৃষকদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এবার কি পরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে, নাকি পানি নিষ্কাশনের সমস্যায় আবারও কোটি কোটি টাকার ফসল হারাতে হবে?